প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
পানি কমায় বেরিয়ে আসছে বন্যার ক্ষত

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই পাঁচ জেলা ছাড়াও বন্যার কবলে পড়েছে সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। বন্যাকবলিত এসব অঞ্চল থেকে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ব্যাপক ক্ষতির চিত্র। তবে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি। বন্যার পানি নামায় ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায়। কোথাও ঘর ধসেছে, কোথাও নষ্ট হয়েছে ফসল। পুকুর ও মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার স্রোতে ভেঙেছে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। বহু গ্রামীণ সড়ক থেকে পানি সরে গেলেও সেগুলো আর চলাচলের উপযোগী নেই।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যা ও ঢলের পানিতে জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ৮৯০ কোটি টাকা। বড় ক্ষতি হয়েছে বান্দরবানের যোগাযোগব্যবস্থায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৪৭টি স্থানে পাহাড় ধস ও ২১ স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু পথ সচল হলেও বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত অংশেরই স্থায়ী সংস্কার দরকার। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো জরুরিভিত্তিতে মেরামতে প্রায় ৭ কোটি টাকা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্নিমাণে লাগতে পারে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। রাঙামাটিতেও অন্তত ১০২ কিলোমিটার সড়কে ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য বলছে, প্রাথমিকভাবে সড়ক খাতে প্রায় ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলার ৯ উপজেলায় ২৫টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সড়কে ক্ষতি বেশি হওয়ায় জরুরি সংস্কার চলছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোহাগাড়ায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সড়কের মাটি সরে গেছে, কোথাও ঢালাই ওঠে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বাঁশখালীতে উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট ও দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু অবকাঠামো খাতেই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
এদিকে রংপুরে তিস্তার পানি কখনো বাড়ছে, আবার কয়েক ঘণ্টা পর আবার কমছে। এ পরিস্থিতিতে সপ্তাহখানেক আগে তিস্তার তীর সংলগ্ন বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। কিন্তু গত সোমবার রাতে দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তীব্র স্রোতের কারণে নবনির্মিত তীর সংরক্ষণকাজের প্রায় ২০০ মিটার নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে কয়েকটি ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়াসহ লোকালয়ে পানি ঢুকে প্রায় এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে তিন গ্রামের দেড় হাজার পরিবারের। অন্যদিকে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলা।
গতকাল বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়ার তালপট্টি নরশিং এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার তীর সংরক্ষণকাজ করা হয়েছে। বাঁধ হওয়ায় চলাচলসহ তিন গ্রামের মানুষ আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু সম্প্রতি তিস্তার স্রোতে সেই বাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। যার কারণে ওই গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরেই তিস্তার পানি দ্রুত ওঠানামা করছে। এরই মধ্যে আকস্মিক বন্যা, তীব্র স্রোত এবং হঠাৎ পানি কমে যাওয়ার কারণে নদীতীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে দেড় হাজার পরিবারের বসতভিটা, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে।
পশ্চিম হরিণচড়া এলাকার আবদুল কাদের বলেন, ‘বাঁধ হইতে না হইতেই কয় মাসের মাথায় সেটাও নদীত চলি গেইল, এইবার হামারগুলার মরণ ছাড়া কোনো বুদ্ধি (উপায়) নাই। তালপট্টি এলাকার রুকনুজ্জামান বললেন, ‘বাঁধ দেওয়ার পর বসতভিটায় টিকি থাকার স্বপ্ন দেকচেনো। সেই বাঁধও ভাঙ্গি গেইল। এ্যালা এ্যাটে থাকি চলি যাওয়া ছাড়া হামার আর কোনো পথ নাই।’ তবে ভাঙন শুরু হওয়ার পরপরই যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা নিত তাহলে হয়তো বাঁধটা ঠেকানো যেত বলে অভিযোগ ওই এলাকাবাসীর।
এ বিষয়ে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে সেখানে ভাঙন শুরু হয়েছে। জরুরিভিত্তিতে সেখানে ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়াও পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরো জিও ব্যাগ ফেলা হবে এবং অন্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা খেতে ফিরে দেখছেন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সরকারি দপ্তরের হিসাবে, ফসলের ক্ষতি দাঁড়াবে কয়েক’শ কোটি। কক্সবাজার জেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল ডুবে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ কৃষকের কয়েক’শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভেসেছে ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর পুকুর ও চিংড়ি ঘেরের মাছ।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ১ হাজার ৬২০টি পুকুর ও মাছের খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে, খামার, পশুপাখি ও খাদ্যের ক্ষতি মিলিয়ে এ খাতে লোকসান প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।
রাঙামাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষিতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, ১০ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে প্রাণিসম্পদ খাতেও। খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার ২৬০ একর জমির ফসল।
খাগড়াছড়ির মহালছড়ির চাষি অজয় বড়ুয়া বলেন, ‘বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, আমার পুকুরের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মাছও ভেসে গেছে। নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সভায় অংশ নেন।
সভা শেষে আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের জানান, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা চলমান বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। মন্ত্রী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ তার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, এরই মধ্যে ত্রাণের জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চাল ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকাল বিকেল চারটার হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এই সাত জেলার ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো আছেন ১০ হাজার ৮৫৪ জন।
"







































