reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত, এক ছাতার নিচে আসছে তিন সংস্থা

বিডা, বেজা, পিপিপি কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত, হচ্ছে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ'

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর দীর্ঘসূত্রতার চিরাচরিত অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটতে যাচ্ছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গতিশীল, আধুনিক এবং ব্যবসাবান্ধব করতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোতে। বিলুপ্ত করা হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষকে। এই তিন প্রভাবশালী সংস্থাকে একীভূত করে সম্পূর্ণ আধুনিক ও স্বায়ত্তশাসিত রূপে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’।

বুধবার( ১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বহুল আলোচিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার মাধ্যমে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে এই নতুন যুগের সূচনা হলো। নতুন এই আইনি কাঠামোর মূল লক্ষ্য—একক জানালার (Single Window) মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে শতভাগ কার্যকর করা এবং বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।

একক ছাতার নিচে তিন শক্তির সমন্বয়: নতুন আইনের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণ ও সমন্বয়হীনতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিশেষ শিল্পাঞ্চল (ইকোনমিক জোন) প্রতিষ্ঠা এবং পিপিপি (PPP) প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম আলাদা আলাদা সংস্থার পরিবর্তে একক এই কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হবে। এর ফলে পূর্বের ২০১০, ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৮ সালের সংশ্লিষ্ট আইনগুলো রহিত করা হয়েছে।

শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের গভর্নিং বোর্ড: ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ একটি সংবিধিবদ্ধ শক্তিশালী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে, যার দৈনন্দিন চালিকাশক্তি হবেন একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য। তবে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গঠিত গভর্নিং বোর্ডের কাঠামোতে রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া:

নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী: গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বা তার মনোনীত ব্যক্তি।

মন্ত্রিসভার অংশগ্রহণ: অর্থ, বিদ্যুৎ, পররাষ্ট্র, ভূমি, শিল্প, বাণিজ্য ও আইন মন্ত্রীরা থাকছেন এই বোর্ডে।

নারীর ক্ষমতায়ন ও বেসরকারি খাত: বেসরকারি খাত থেকে ৪ জন প্রতিনিধি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত হবেন, যার মধ্যে ২ জন নারী প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

‘সিঙ্গেল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’: বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর হলো—সব ধরনের লাইসেন্স, অনুমোদন, ভিসা সুপারিশ, কাজের অনুমতি ও ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য একটি বাধ্যতামূলক ‘সিঙ্গেল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হচ্ছে।

বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি: বর্তমানে চালু থাকা সব ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা পৃথক পোর্টাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই নতুন প্ল্যাটফর্মে একীভূত করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো সংস্থা আর নিজস্ব পোর্টাল ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো দপ্তর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি করলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এই কর্তৃপক্ষকে।

শিল্পাঞ্চল ও পরিবেশবান্ধব ‘ব্লু ইকোনমি’: নতুন আইনে শিল্পাঞ্চল স্থাপনের ধারণায় আধুনিক বৈশ্বিক এজেন্ডাকে যুক্ত করা হয়েছে। রপ্তানি ও বাণিজ্যিক এলাকার পাশাপাশি এখন থেকে পৃথক জোন করা যাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ শিল্প, জলবায়ু সহনশীলতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও খাদ্য নিরাপত্তা. ব্লু ইকোনমি (নীল অর্থনীতি) ও উপকূলীয় শিল্প।

প্রকল্পের প্রয়োজনে যেকোনো ভূমি অধিগ্রহণকে 'জনস্বার্থে' বিবেচনা করে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বা অব্যবহৃত জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া যাবে।

জাতীয় অগ্রাধিকার ও পিপিপি প্রকল্প: আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বা জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে যেকোনো প্রকল্পকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প’ ঘোষণা করা যাবে। পিপিপি প্রকল্পের দরপত্র ও দরকষাকষির নথিগুলোর গোপনীয়তা রক্ষা করার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। যেকোনো চুক্তিভিত্তিক বিরোধের ক্ষেত্রে ঢাকাতেই সালিশের মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার ও শ্রমিক অধিকার: সরকারের বন্ধ বা লোকসানি শিল্প প্রতিষ্ঠান, অব্যবহৃত জমি ও শেয়ার এখন থেকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হস্তান্তর বা কৌশলগত বিক্রয় (Strategic Sale) করা যাবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা হয়েছে—বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে সর্বাগ্রে শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

সমৃদ্ধির নতুন মহাসড়ক: ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিল—বিশ্বায়নের এই যুগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেছনে ফেলে স্মার্ট ইকোনমি গড়ে তুলতে দেশ প্রস্তুত। বিলুপ্ত তিন সংস্থার সমস্ত সম্পদ ও জনবল নতুন কর্তৃপক্ষের অধীনে স্থানান্তরিত হচ্ছে, ফলে কাজের ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হবে না। একটি সমন্বিত, ডিজিটাল এবং নারীবান্ধব নীতিনির্ধারণী কাঠামোর মাধ্যমে এই নতুন আইনটি ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়