প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ইরানে ফের যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা ট্রাম্পের
কংগ্রেসকে বললেন, চুক্তি এখনো সম্ভব

ইরানে ফের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার ইরানি বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর বাইরে, ইরানে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন বা কুহ-ই কোলাং গাজ লা পর্বত ধ্বংস করারও হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। তবে আশার বাণী হিসেবে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এখনো একটি চুক্তি সম্ভব। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।
খবরে বলা হয়েছে, এ হামলার মধ্যেও ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি এখনো ‘সম্ভব।’ আরব আমিরাতের তথ্যমতে, ইরান এ কৌশলগত পানিপথে দুটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় একজন ক্রু বা নাবিক নিহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের ৫ ঘণ্টার এ অভিযানটি পুরো ইরানজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে উপকূলীয় বুশেহর এবং বন্দর আব্বাস রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ইরানি সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে এ হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা বাহরাইনে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সেখানে মার্কিন বাহিনীর একটি আবাসিক ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আজ রাতে তাদের ওপর খুব শক্ত আঘাত হানতে যাচ্ছি। আমরা আগামীকালও তাদের ওপর শক্ত আঘাত হানব।’ এ হামলার পরেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী অবরোধের ঘোষণা দেন। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে দুই দেশ এত বড় আকারের হামলা আর করেনি। এ ঘটনা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রচেষ্টাকে আরো সংশয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান এ প্রণালীটি বন্ধ করা শুরু করে। এর জবাবে ওয়াশিংটন তেহরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল। তবে গত জুনে দুই পক্ষ একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর এ নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করা হয়েছিল। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ প্রণালীর ‘নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।’ তারা এ পথ দিয়ে যাওয়া সমস্ত পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক বা ফি আরোপ করবে। এ ঘোষণাকে ইরান উপহাস করে ‘দস্যুতা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা থেকে বা বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ২টা থেকে এ ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করা হবে।
মার্কিন হামলার জবাবে তেহরান এ অঞ্চলে অন্যান্য মার্কিন মিত্রদের ওপরও হামলা শুরু করেছে। এর মধ্যে জর্ডানও রয়েছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, তাদের এ হামলা একটি বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তারা জর্ডানের নাগরিকদের প্রতি একটি আহ্বান জানিয়েছে। তারা জর্ডানবাসীকে ‘অঞ্চল থেকে দখলদার মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরানোর জন্য জোরালো দাবি’ তোলার আহ্বান জানিয়েছে। সোমবার বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত এবং ওমানে হামলার ঘোষণার পর এ হামলাগুলো চালানো হয়েছে। ইরান দাবি করছে, তারা শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে তাদের সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সহযোগিতা করে, তবে তাকে ‘যুদ্ধের শামিল’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আবার সামরিক সংঘাত শুরু করেছে। ট্রাম্প গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে এটি অবহিত করেছেন। হোয়াইট হাউস এএফপিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর ফলে পেন্টাগন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এ অঞ্চলে অভিযান চালানোর জন্য অতিরিক্ত ৬০ দিন সময় পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো একটি হুমকি দিয়েছেন। তিনি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন বা কুহ-ই কোলাং গাজ লা ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন। এটি নাতাঞ্জের কাছে মাটির গভীরে অবস্থিত একটি পারমাণবিক স্থাপনা। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের সন্দেহ, ইরান এখানে একটি অঘোষিত সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করছে।
তিনি রক্ষণশীল রেডিও হোস্ট হিউ হিউইটকে বলেন, ‘ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন। তাদের জানিয়ে দিন যে আমরা আসছি এবং তারা এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না।’ ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ‘হরমুজ প্রণালীর অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত হবে। তারা এ পানিপথ দিয়ে যাওয়া সব পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ফি ধার্য করবে। ইরানের বন্দরগুলো আবার অবরুদ্ধ করা হবে। তবে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যান্য সব দেশ এ প্রণালীটি ন্যায্য এবং উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারবে।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে উপহাস করে এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, ট্রাম্প ‘একদম ঠিক’ বলেছেন। যে পক্ষ নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দেবে, তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। তবে তেহরান এ ফি কিছুটা কম নেবে। তিনি বলেন, ‘২০ শতাংশ অবশ্যই অনেক বেশি।’
হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের টোল বা ফি আদায়ের ইচ্ছার তীব্র বিরোধিতা করেছিল ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাধারণত এটি নিষিদ্ধ। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প সোমবার অন্য কথা বলেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ করতে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি এখনো সম্ভব। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার বলেন, গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি এখন ‘সংকটে।’ এ সমঝোতা স্মারকটি আলোচনার ভিত্তি ছিল এবং এর মাধ্যমেই মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। বাঘাই বলেন, ওয়াশিংটন যদি চুক্তির নিয়ম অমান্য করে, তবে ইরানও চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো উপেক্ষা করবে। তবে তিনি আরো যোগ করেন, তেহরান কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাওয়া রোধ করতে এ আলোচনা করছে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের একজন সহযোগী ফেলো বদর আল-সাইফ একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এ ক্রমবর্ধমান হামলা একটি স্থায়ী চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াকে শুধু বিলম্বিত করবে। তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষই নিজেদের শর্তে এ অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে চায়। কিন্তু দিন দিন তাদের জন্য এটি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আর এ কারণেই তারা আবারও হামলা শুরু করেছে এবং হামলার পরিধি বাড়িয়েছে।’ এর আগে গত মে মাসে ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হলে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। একইসঙ্গে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। চুক্তি ভঙ্গের দায় একে অপরের ওপর চাপাচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
"






































