মেহেদী হাসান

  ৩ ঘণ্টা আগে

দেশে তামাক চাষ বেড়েছে ১৫ হাজার একর

আধুনিক কৃষিতে ফসল নির্বাচনে কৃষক বেশ পারদর্শী। লাভ-লোকসানের হিসেব গুনতে খুববেশি সময় নেন না। তবে দ্রুত লাভের আশায় ফসল নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেকাংশে সামগ্রিক কৃষিতে ঝুঁকি তৈরি করেন। বর্তমানে ধান চাষ কমে বাড়ছে তামাক চাষ। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তামাকের আবাদ ১ লাখ ৭ হাজার একর থেকে বেড়ে ১ লাখ ২২ হাজার একর ছাড়িয়ে গেছে। তামাকের উৎপাদনও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিশ্চিত বাজার, আগাম অর্থায়ন এবং চুক্তিভিত্তিক চাষের সুবিধা তামাকের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ফসল পরিসংখ্যান এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরি’ শীর্ষক ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। কৃষকের ভাষ্য, উৎপাদন খরচ, বাজারদর এবং লাভ-লোকসানের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে কৃষক ঐতিহ্যগত ধান ও পাটের পরিবর্তে সরিষা, আদা, হলুদ, বিভিন্ন শীতকালীন সবজি; এমনকি তামাকের মতো তুলনামূলক বেশি লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদনেও। একদিকে আউশ ধান ও পাটের আবাদ-উৎপাদন কমেছে; অন্যদিকে বেড়েছে তেলবীজ, মসলা ও সবজির উৎপাদন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে ১০.৯৪ শতাংশ। মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪.৬৮ শতাংশই কৃষিনির্ভর। কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তন আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রাক্কলন আরো নির্ভুল করতে এবার নিয়মিত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কৃষি উৎপাদন ও কৃষিশ্রমিকের মজুরির তথ্য প্রকাশ শুরু করেছে বিবিএস। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমান বলেন, কৃষক এখন লাভ-লোকসানের হিসাব করেই ফসল নির্বাচন করছেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় আউশ ধান ও পাট চাষে আগ্রহ কমছে। অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায় এমন সবজি, সরিষা ও অন্যান্য বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন তারা। তিনি বলেন, মোট ধান উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ আসে আউশ থেকে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক এ ফসল থেকে সরে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে তামাক চাষে লাভ বেশি হওয়ায় সরকারি নিরুৎসাহ সত্ত্বেও এর আবাদ বাড়ছে। দেশে সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হয় কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলার ছয় উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ১১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। গত বছর ১০ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছিল। প্রতিবারই দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ করা হয়। ২০১৯-২০ সালে দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলায় তামাক চাষ হয়েছিল ১০ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে। এবার চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৩৬৬ হেক্টর জমিতে।

এর মধ্যে দৌলতপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৮৫ হেক্টর, ভেড়ামারায় ৮৩০ হেক্টর এবং মিরপুর উপজেলায় ৬ হাজার ৮৫১ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। মিরপুর উপজেলায় কৃষি জমি ২৩ হাজার ১১১ হেক্টর, ভেড়ামারায় ১০ হাজার ৮৯১ হেক্টর এবং দৌলতপুর উপজেলায় কৃষি জমি রয়েছে ৩২ হাজার ৪৪৮ হেক্টর। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, তামাক চাষ ও সেবন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তামাক পাতা, বিড়ি, সিগারেট, গুল, খইনি ও জর্দাসহ এ ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করায় বাড়ছে ক্যানসারসহ নানা রোগ। তামাক চাষে কৃষকের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। এছাড়া তামাক কাটার পর রোদে শুকিয়ে অঁটি বেঁধে ঘরে তুলতে হয়। বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত নাড়াচাড়া করতে হয়। এরপর তামাক যায় কোম্পানির গোডাউনে। সেখানেও তামাক পাতা সংরক্ষণ করতে হয়। এতে তামাকের গন্ধ সরাসরি মানবদেহে প্রবেশ করে শিশুসহ নানা বয়সি মানুষ আক্রান্ত হয় নানা রোগে।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আউশ ধানের আবাদ কমে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫১৬ একরে নেমেছে, যা আগের বছর ছিল ২৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩৪ একর। উৎপাদনও ২৭ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪৬ টন থেকে কমে ২৭ লাখ ৮ হাজার ১৯১ টনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পাটের আবাদ ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৪ একর থেকে কমে ১৬ লাখ ৭৫ হাজার ৭৯৯ একরে নেমেছে। উৎপাদনও প্রায় ৮৯ লাখ ৫৩ হাজার বেল থেকে কমে ৮৮ লাখের কিছু বেশি বেলে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক-সংকট এবং বাজারদরের অনিশ্চয়তা পাট চাষে আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হয়। দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ বলছে, যারা তামাক চাষ ও তামাকের কাজ করেন, তাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। তারা ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা, টিবিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। তামাকের গুঁড়া বাতাসের সঙ্গে মানুষের শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। সবচেয়ে বেশি ফুসফুসের রোগ হয়। তামাকের কাজ করার কারণে অনেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

অন্যদিকে সরিষা চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরিষার আবাদ বেড়ে ১১ লাখ ৬৩ হাজার ১৪৪ একরে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৫ একর। উৎপাদনও বেড়ে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ টনে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে আদার উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার টন এবং হলুদের উৎপাদন প্রায় ৪০ হাজার টন বেড়েছে। শীতকালীন সবজির মধ্যে মূলা, বাঁধাকপি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, লালশাক ও খিরাইয়ের উৎপাদন বেড়েছে। ফলের মধ্যে মাল্টা, জলপাই, কুল, পাকা পেঁপে ও ডালিমের উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রতিবেদন আরো বলছে, একই সময়ে কৃষিশ্রমিকের মজুরি আগের বছরের তুলনায় উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, যা গ্রামীণ শ্রমবাজারে শ্রমিকসংকট এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়