বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের ১৭ জেলায় বন্যার শঙ্কা

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই গতকাল মঙ্গলবার সারা দিন থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে ঢাকার অনেক সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। রেললাইন তলিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি।
এদিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভারী বৃষ্টি ও নদনদীর পানি বৃদ্ধির কারণে চার বিভাগের ১৭ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের চট্টগ্রাম বিভাগে অতিভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরায়ও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এছাড়া ভারতের ঊড়িষ্যা ও সংলগ্ন দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে পূর্ব মধ্যপ্রদেশ সংলগ্ন এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপ হিসেবে অবস্থান করছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদনদীর পানি কমেছে। আগামী তিন দিন পানি আরো কমে পরবর্তী দুদিন বাড়তে পারে। তবে এ সময় নদীগুলো বিপৎসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানিও গত ২৪ ঘণ্টায় কমেছে। গঙ্গার পানি আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী দুদিন বাড়তে পারে। অন্যদিকে পদ্মার পানি আগামী পাঁচ দিন কমতে পারে। দুটি নদীই বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদনদীর পানি আগামী তিন দিন দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানি বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানিও আগামী তিন দিন দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু এলাকায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও দ্রুত বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক প্লাবনের সৃষ্টি হতে পারে।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা ও কুয়াইশসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী, বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ। গতকাল সকালে নগরীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ভারী বৃষ্টির পর নিচু এলাকাগুলোয় পানি জমতে শুরু করে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার এর চেয়েও বেশি পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, কাজিরহাট, হালিশহর, চান্দগাঁও, সুন্নিয়া মাদরাসা রোড, আকমল আলী রোড, পতেঙ্গা ও কুয়াইশ এলাকার বাসিন্দারা। এসব এলাকার অনেক বাসা ও দোকানে পানি ঢুকে গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও ব্যবসায়িক মালামালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। চকবাজারের বিভিন্ন অলিগলিও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়।
রেললাইন তলিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ : কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ষোলশহর সুন্নিয়া মাদরাসা এলাকায় রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকায় ৮১৬ নম্বর পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি থামিয়ে রাখা হয়েছে। গতকাল বিকেলে প্রবল বৃষ্টির পর রেললাইনের ওপর পানি উঠে গেলে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি আটকে দেয়। রেলওয়ে সূত্র জানায়, পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৌশল বিভাগ রেললাইন পরিদর্শন করবে। ট্র্যাক নিরাপদ ঘোষণা করা হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ঢাকা ও কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এদিকে ট্রেনটি দীর্ঘসময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকেই ট্রেনের ভেতরে অপেক্ষা করছেন বলে জানান যাত্রীরা। পাহাড়তলী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা বলেন, রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ট্র্যাক নিরাপদ ঘোষণা করা হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে।
শাহ আমানতে নামতে পারেনি তিন ফ্লাইট : বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। গতকাল সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এ তিনটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় ঢাকায় ফিরে গেছে। তিনটি ফ্লাইটের মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক ও একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। এদিকে বিমান অবতরণ করতে না পারলেও চট্টগ্রাম থেকে সব বিমানের যাত্রা হয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এদিন সব অ্যারাইভাল ও ডিপার্চার ফ্লাইট স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, টানা ভারি বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-৩৫০ (আবুধাবি-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটি প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই কারণে এয়ার অ্যারাবিয়ার জি-৯-৫২৬ (শারজাহ-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটিও ঢাকায় অবতরণ করানো হয়। এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১২১ (ঢাকা-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটি চট্টগ্রামে অবতরণ সম্ভব না হওয়ায় পুনরায় ঢাকায় ফিরে যায়।
উখিয়ায় মাটির ঘরের দেয়ালচাপায় নিহত ১ : উখিয়া প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে মো. মালেক (৪০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টায় উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জামবাগান এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, জামবাগান এলাকার মো. এখেলাসের বাড়িতে দুপুরে খাবার খাওয়ার সময় অতিবৃষ্টির কারণে মাটির একটি দেয়াল হঠাৎ ধসে পড়ে। এতে দেয়ালের নিচে চাপা পড়েন মালেক। পরে স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৫টায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণের কারণে ঘরের মাটির দেয়াল ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহতের নাম মো. মালেক। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’ উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছে। প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। চলমান ভারী বর্ষণের কারণে কাঁচা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’ এদিকে কয়েকদিনের টানা বর্ষণে উখিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধস ও দেয়াল ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কাঁচা ঘর, পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
"









































