শফিকুল ইসলাম

  ৪ ঘণ্টা আগে

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্মত ঢাকার সন্তোষ প্রকাশ

দীর্ঘদিনের সংঘাত ও উত্তেজনার পর অবশেষে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ১৯ জুন শুত্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালী টোলমুক্তভাবে উন্মুক্ত করার এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এ যুদ্ধ বিশ্বে নানামুখী সংকট সৃষ্টি করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এ প্রাণঘাতী ও সম্পদবিধ্বংসী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। এ সংবাদে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এ শান্তি স্থাপনের জন্য ওয়াশিংটনের ট্রাম্প প্রশাসন ও তেহরানের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

গত রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পৃথক ঘোষণায় এ তথ্য জানান। একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও শান্তিচুক্তির খবর প্রচার করা হয়। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পূর্ণ। সবাইকে অভিনন্দন। আমি হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে উন্মুক্ত করার এবং একইসঙ্গে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিচ্ছি।’ ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক মিনিট আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, নিবিড় আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, উভয়পক্ষ লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধে সম্মত হয়েছে। শাহবাজ জানান, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। এর আগে বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কিছু আলোচনা সম্পন্ন করা হবে। এদিকে চুক্তির আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে হোয়াইট হাউস। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি নিজে ইলেকট্রনিকভাবে অথবা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘এটি শান্তির নতুন এক দিগন্ত। আজ রাতে আমরা বড় একটি পদক্ষেপ নিয়েছি।’

অবসান হচ্ছে নৌ-অবরোধ : ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিভাবাদি দেশটির আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে জানান, সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে এবং রবিবার রাত থেকেই মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার শুরু হচ্ছে। আজই শান্তিচুক্তির আশা ট্রাম্পের, ভিন্ন সুর ইরানের। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর সংঘাতের সূচনা হয়। এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধের কারণে উভয়পক্ষের মধ্যে মাঝেমধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে।

লেবানন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ : চুক্তি নিয়ে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বা লেবানন সরকারের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে চুক্তি ঘোষণার দিনই বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এ ঘটনার সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ‘এ বিশেষ দিনে যখন আমরা শান্তিচুক্তির এত কাছাকাছি, তখন এ হামলা হওয়া উচিত হয়নি। সব পক্ষেরই এখন সংযম দেখানো উচিত। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএর তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইরানে ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া লেবাননে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ। উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। আরো দুজন মার্কিন নাগরিক অন্য কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও স্বস্তি ফিরতে পারে।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়াকে বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশ সবসময়ই সংলাপ ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে এসেছে। এ ইতিবাচক অগ্রগতিতে যেসব পক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীরা ভূমিকা রেখেছেন, বাংলাদেশ তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করেছে যে, চুক্তিটি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এ ইতিবাচক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাকি সমস্যাগুলোও সংলাপ ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ আশা করছে, খুব শিগগির অঞ্চলে শান্ত পরিবেশ ফিরে আসবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) ও পারস্পরিক সহযোগিতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করা হয়েছে। গত রবিবার নিজের ৮০তম জন্মদিন উদযাপনকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন।’

যা থাকছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে : সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এছাড়া ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরান থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। চুক্তিতে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠন কর্মসূচিতে সহায়তা করবে। এজন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে ইরান। এছাড়া অঞ্চলটিতে নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করা এবং অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অঙ্গীকারও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মেহর নিউজ জানায়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ হওয়া ইরানি তহবিলের অন্তত অর্ধেক মুক্ত না করা পর্যন্ত, ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নৌ-অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে না। বার্তা সংস্থাটি আরো জানায়, দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত যে চুক্তি হবে, তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চুক্তির বিষয়ে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়া হবে। বিশ্বের জাহাজগুলোকে ‘ইঞ্জিন চালু’ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তেল পরিবহন আবারও স্বাভাবিকভাবে চলবে।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়