নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক নিয়োগ

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত রবিবার রাতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালককে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এদিন ব্যাংকটিকে আরো আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে টাকা উত্তোলনের চাপ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হুসাইনের নেতৃত্বে শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এরপর রাত ১০টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পর্ষদ সদস্যের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ধারা ও ৪৭(৩) ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক-কোম্পানি, আমানতকারী ও জনসাধারণের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইনের নেতৃত্বে রবিবার বিকেল ৪টায় ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যান। সন্ধ্যা ৭টার পর তারা বের হন। ওই সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে ব্যাংকটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের পর ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন প্রশাসক দিয়ে কতদিন চলবে ইসলামী ব্যাংক কারণ এটি কোনো ছোট বা দুর্বল ব্যাংক নয়। প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত, দেশের বৃহত্তম রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক এবং শিল্প খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্যানুযায়ী, ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ৪৭(৩) ধারার ক্ষমতাবলে আমানতকারী, ব্যাংক এবং জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক একের পর এক সংকটের মুখে পড়ে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, গ্রাহকের বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা, সংসদে আলোচনা এবং বড় অঙ্কের আমানত উত্তোলনের ফলে ব্যাংকটির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। মোহাম্মদ জহির হোসেন এখন কার্যত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিকল্প। তিনি এককভাবে পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এবং ব্যাংকের কৌশলগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবেন। তার সামনে প্রধান চারটি চ্যালেঞ্জ, গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা; তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা; বড় ঋণ ও খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করা; ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করা। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পর্যায়ে প্রশাসকের কাজ শুধু দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা নয়; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত’ মোহাম্মদ জহির হোসেন দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ আপাতত কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, প্রশাসক ব্যবস্থা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত তিনটি ধাপ অনুসরণ করে, প্রথম ধাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা; দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং তৃতীয় ধাপে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময়ও লাগতে পারে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছিল, ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে নতুন একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক গঠন করা হবে। পরবর্তীতে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নিয়োগ পেয়েছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রশাসক ব্যবস্থা স্থায়ী হয়নি; বরং পুনর্গঠনের একটি মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের অধিকাংশের ধারণা, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে একীভূতকরণের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ ইসলামী ব্যাংক এখনো দেশের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর ব্যাংকগুলোর একটি। এর শাখা নেটওয়ার্ক, আমানতভিত্তি, গ্রাহক সংখ্যা এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতা অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় শক্তিশালী। ফলে এটিকে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার পরিবর্তে পুনর্গঠন এবং নতুন পরিচালনা কাঠামো গড়ে তোলার পথেই হাঁটতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাবেক ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান প্রশাসকের প্রধান কাজ হবে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন করা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো কোনো সময়সীমা ঘোষণা করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সাম্প্রতিক বিতর্কের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মালিকানা ও সুশাসন সংকটও রয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ, ঋণ বিতরণ এবং করপোরেট শাসন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এ কারণে নতুন প্রশাসকের সামনে শুধু বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার কাজ নয়; অতীতের অনিয়মের প্রভাবও মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। প্রশাসকের লক্ষ্য ব্যাংক পরিচালনা করা নয়, বরং এমন একটি অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া যেখানে একটি শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নিতে পারে। সেই অর্থে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের ওপর।
যদি তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, গ্রাহকের উদ্বেগ কমে এবং ব্যাংকের কার্যক্রম স্থিতিশীল থাকে, তাহলে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পথ দ্রুতই খুলে যেতে পারে। তবে যদি আস্থার সংকট দীর্ঘায়িত হয়, আমানত প্রত্যাহারের চাপ অব্যাহত থাকে কিংবা আর্থিক অনিয়মের নতুন তথ্য সামনে আসে, তাহলে প্রশাসকের মেয়াদও দীর্ঘ হতে পারে। এখন থেকে তিনি পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আগের পর্ষদ ভেঙে বাংলাদেশ ব্যাংকই এ পর্ষদ গঠন করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন গভর্নর। এদিন ব্যাংকটিকে বিশেষ ধার হিসেবে আড়াই হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক শুরু হয়। তাকে অপসারণসহ ৭ দফা দাবিতে গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন করে আসছে একটি পক্ষ।
ইসলামী ব্যাংক সূত্র জানায়, চলমান কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ব্যাংকটির পরিচালকরা ব্যাংকে আসতে পারছিলেন না। যে কারণে নীতিনির্ধারণী কোনো সভা হচ্ছিল না। নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে অনলাইনে একটি সভা হলেও তা নিয়ম মেনে হয়নি। ওই পর্ষদ সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। আবার কোনো এজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়নি। এরকম অবস্থায় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত আটকে আছে। আবার ব্যাংকটিতে এখন নিয়মিত এমডি নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করেন। ইসলামী ব্যাংকের সংকট পুরো ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা জানিয়ে গত সপ্তাহে ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন এবিবি উদ্বেগ জানায়। গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক থেকে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানান সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে জাতীয় সংসদেও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়।
"








































