কূটনৈতিক প্রতিবেদক
ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব
উপদেষ্টার সঙ্গে অসৌজন্যের প্রতিবাদ বাংলাদেশের

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে অসৌজন্যমূলক আচারণের প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে গতকাল এর প্রতিবাদ করা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, পুশইন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে যখন নাজুক পরিস্থিতি চলছে, তখন দিল্লির এ ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে কালো ছায়া ফেলবে।
জানা গেছে, দিল্লি বিমানবন্দরে অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কর্তৃপক্ষের ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’ এবং দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার প্রতিবাদে সরকারি সফর বাতিল করে দেশে ফিরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের বাধা দেওয়ার ঘটনায় ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢ়েকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তার কাছে এ ঘটনার প্রতিবাদ ও অন্তোষ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দিল্লির বিমানবন্দরে ওই ঘটনার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিষয়টি ভারতীয় কূটনীতিকের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগ) ইশরাত জাহান ভারতীয় দূতকে তলব করেন। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ যথাযথ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, পুরো ঘটনা জেনে যদি কোনো অ্যাকশন নেওয়ার থাকে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব। এ বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় ডা. জাহেদ উর রহমান শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের’ (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুদিনব্যাপী বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের। কূটনৈতিক প্রটোকল মেনে আগাম তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও গত রবিবার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর ডা. জাহেদ উর রহমানকে আড়াই ঘণ্টা ইমিগ্রেশন রুমে বসিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীকালে ভারতের উচ্চমহলের হস্তক্ষেপে তাকে দেশে প্রবেশের ছাড়পত্র দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণ দেখিয়ে তিনি রাজধানী নয়া দিল্লিতে প্রবেশ না করে ফিরতি ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরেছেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, গতকাল সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের’ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল জাহেদ উর রহমানের। এ সফরের বিষয়ে গত শুক্রবারই দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক পত্রের (নোট ভারবাল) মাধ্যমে অবহিত করেছিল। রবিবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে বিমানবন্দরে আটকে দেন এবং প্রায় আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন সরকারি উপদেষ্টার সঙ্গে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা যে আচরণ করেছেন, তা অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক এবং প্রটোকল পরিপন্থি। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে উপদেষ্টা নিজেই কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিজের পাসপোর্ট ফেরত চান এবং পরবর্তী ফ্লাইটে তিনি দেশে আসেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পরবর্তী সময়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে সসম্মানে ভারতে প্রবেশের অনুরোধ জানালেও ডা. জাহেদুর রহমান সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দিল্লি থেকে কলম্বো হয়ে ঢাকার পথ ধরেন। এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-নিউজ১৮ সূত্রের বরাতে জানায়, উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের নাম
ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি নজরদারি তালিকায় (ওয়াচ লিস্ট) থাকায় এ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। দিল্লি বিমানবন্দরে নিয়মিত তল্লাশির সময় অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাময়িকভাবে আটকে রাখেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এটি মূলত একটি ‘প্রশাসনিক ত্রুটি’ ছিল। পরবর্তী সময়ে অসংগতিটি চিহ্নিত হওয়ার পর দেশটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে দ্রুত বিষয়টির সমাধান করা হয় এবং উপদেষ্টাকে দিল্লি ঢুকার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত কিছু ইনফ্লুয়েন্সার ও অ্যাকটিভিস্টের ইউটিউব চ্যানেল ব্লক করে ভারত। তাদের বিরুদ্ধে ভারতবিরোধী প্রচারণার অভিযোগ করা হয়। ভারতের নিরাপত্তা নজরদারি তালিকায় ডা. জাহেদ উর রহমানের নামও যুক্ত ছিল।
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার কারণে কূটনৈতিক পাসপোর্ট (ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট বা লাল পাসপোর্ট) পাওয়ার যোগ্য হলেও এ সফরে তিনি তার সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন বলে জানায় তার ঘনিষ্ঠ সূত্র। তবে সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ হাইকমিশন কর্তৃক প্রেরিত কূটনৈতিক পত্রের কারণে তার রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পাওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ প্রটোকলের চরম লঙ্ঘন। এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ভারতের দিল্লি বিমানবন্দরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় গতকাল ঢাকায় ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢ়েকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, সোমবার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকের দপ্তরে পবন বঢ়েকে ডেকে দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এসে টেলিভিশন টকশোর মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছিলেন ডা. জায়েদুর রহমান। চলতি বছর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় পলিসি ও স্ট্রাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করেন। জাহেদ উর রহমানকে নিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসছে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার দুই দেশের দিক থেকেই সম্পর্কোন্নয়নের আগ্রহ ব্যক্ত করা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি ভারত থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ‘কথিত বাংলাদেশি’ হিসেবে লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে এবং এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা আছে। কর্ণফুলী নদীর তীরঘেঁষা ছোট্ট শিল্প শহর চন্দ্রঘোনায় শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের। বাবা আজিজুর রহমানের কর্মসূত্রে চন্দ্রঘোনায় থাকতেন তিনি। কেপিএম স্কুলের ১৯৯১ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের কোটরামহব্বতপুর গ্রামে তার বাড়ি।
"









































