বিবিসি

  ৩১ জুলাই, ২০২১

বর্ণবৈষম্যের শিকার উত্তর-পূর্ব ভারত

মীরাবাঈ চানু টোকিও অলিম্পিকসের ভারত্তোলনে রুপা জয়ের পরে সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, দেশের জন্য মেডেল জিতলে তবেই উত্তর-পূর্বের মানুষ ‘প্রকৃত ভারতীয়’ হয়ে ওঠেন, আর অন্য সময়ে তাদের ডাকা হয় নানা কুরুচিকর ভাষায়। ওই পোস্টের পরে আলোচনা শুরু হয়েছে কেন নিজের দেশেই বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হবেন উত্তর-পূর্বের মানুষ। এই পোস্ট করেছিলেন অভিনেতা মিলিন্দ সোমানের স্ত্রী অঙ্কিতার কোঁয়ার, যিনি আসামেরই মানুষ।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যারা পড়াশোনা বা কাজের সূত্রে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় থাকেন, তারা নিয়মিতই রাস্তাঘাটে বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় চেহারার জন্য।

মেঘালয়ের বাসিন্দা ফিলারিমা কলকাতায় থাকেন পড়াশোনার জন্য। যেমনটা থাকেন উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী। ওই অঞ্চলের আরো বহু মানুষ কলকাতায় কাজ করেন। গোটা দেশে সংখ্যাটা কয়েক লাখ।

ফিলারিমা এখন ফিরে গেছেন নিজের শহর মেঘালয়ের শিলংয়ে। তিনি জানান, কলকাতায় থাকার সময়ে তাকে এবং তার মতো উত্তর-পূর্বের বাসিন্দাদের কীভাবে বর্ণবাদের শিকার হতে হয়েছে।

ফিলারিমার কথায়, ‘কখনো আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে যে আমি ব্রুস লি-র দূরসম্পর্কের আত্মীয় কিনা, অথবা চীনা ভাষা বলতে পারি কিনা, আমার ব্ল্যাক বেল্ট আছে কিনা! এগুলো বলা হতো এমনভাবে যেন আমি চীনা নাগরিক।’

‘একদিন তো রাস্তায় চীনা চীনা বলে ডাকা হয়েছে, আর বলা হয়েছে আমি যেন নিজের দেশে ফিরে যাই। অথচ যারা এগুলো বলতো, তাদের অনেকেই জানত যে আমি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। তবুও খুব হাল্কা চালে এ ধরনের কথা শুনতে হতো এমনকি শিক্ষিত মানুষের মুখ থেকেও,’ জানাচ্ছিলেন ফিলারিমা।

উত্তর-পূর্বের বাসিন্দা, যারা অন্য প্রদেশে থাকেন, তাদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাকে ওই অঞ্চলের বাইরে কোথাও কখনো অপমান হজম করতে হয়নি।

তাদের কুরুচিকর নামে ডাকা, অশ্লীল কথা বলা সহ্য করতে হয়। কয়েক বছর আগে দিল্লিতে উত্তর-পূর্বের একাধিক বাসিন্দাকে মারধর করা হয়, মুখে থুতুও ছেটানো হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই বাড়ি ফিরে চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছু করার থাকে না অনেকের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাগাল্যান্ড থেকে কলকাতায় একটি নামি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করতে আসা এক নারী বলেন, ‘আমি যদি কাজের ক্ষেত্রে খুব ভালোও করতাম, তাহলেও কোম্পানির কর্মকর্তারা কোনো ধরনের প্রশংসা করতেন না। অথচ সেই একই কাজটা যদি কোনো বাঙালি সহকর্মী করত, তাহলে সে কিন্তু প্রশংসা পেত টিম লিডারের কাছ থেকে।’

এই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো সম্ভবত তিনি উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে গিয়েছিলেন বলেই। ভারতের বেশির ভাগ মানুষের চেয়ে তাদের চেহারা ভিন্ন রকম সেজন্যই এটা করা হতো বলে তার ধারণা। এই অপমানগুলো আমি বাঙালি সহকর্মীদের কাছে বলতেও পারতাম না। উত্তর-পূর্বের অন্য বন্ধুদের সঙ্গেই এসব নিয়ে কথা হতো, আর বাড়ি ফিরে চোখের জল ফেলতাম। আসামের গুয়াহাটির সমাজকর্মী আঞ্জুমান আরা বেগম এ ধরনের আচরণের শিকার হননি, কারণ তার চেহারায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছাপ নেই।

আঞ্জুমান রাজস্থানে গিয়েছিলেন সামাজিক কর্মকর্তাদের কোনো এক বৈঠকে। সেখানে তাকে নাগাল্যান্ড প্রসঙ্গে শুনতে হয়েছে যে, ওই রাজ্যের বাসিন্দারা তো নগ্ন থাকেন তারা নাকি পোশাক পরেন না। ‘নাগা শব্দটির যে অর্থ ওই সামাজিক কর্মকর্তারা জেনে বসে আছেন, সেটা হলো নগ্ন। সেখান থেকেই তারা ধারণা করে নিয়েছেন যে নাগাল্যান্ডে কেউ পোশাক পরেন না।’

‘এটা বহু ক্ষেত্রেই দেখেছি যে, উত্তর-পূর্ব সম্বন্ধে অন্য রাজ্যের মানুষ নিজেরাই একটা ধারণা তৈরি করে নেয়, যেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুল।’

গুয়াহাটির এই সমাজকর্মী আরো বলেন, ‘একবার মেঘালয়ের এক সামাজিক কর্মকর্তা আর আমি কোনো একটা শহরের হোটেলে চেক-ইন করছিলাম একসঙ্গে। আমার কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চাইল রিসেপশনিস্ট, কিন্তু ওই মেয়েটির কাছে পাসপোর্ট চাইল।’

‘আমি প্রতিবাদ করাতে জবাব পেলাম যে বিদেশিদের কাছ থেকে পাসপোর্টই একমাত্র পরিচয়পত্র হিসেবে নেওয়া হয়। অর্থাৎ সে ভেবেই নিয়েছে যে মেঘালয়ের বাসিন্দা ওই বন্ধুটি চীনা!

উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের সঙ্গে বর্ণবৈষম্য করা তো হয়ই, তবে বেশি অপমানজনক কথা শুনতে হয় সম্ভবত ওই অঞ্চলের নারীদের। তাদের উদ্দেশ্যে করা কটূক্তিগুলিতে অনেক সময়েই যৌনতা মেশানো থাকে।

পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্বের অধ্যাপিকা ঋতু সেন চৌধুরীর ব্যাখ্যা, উত্তর-পূর্বের নারীরা নানা জায়গায় চলে যান, তারা শিক্ষিত এবং স্বাধীনচেতা- যেটা ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষের চোখে বেমানান।

এটা ইনস্টিটিউশানাল রেসিজিম। এর কারণ বোধহয় উত্তর-পূর্বের মেয়েদের ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মেয়েদের থেকে মোবিলিটি বেশি, শিক্ষার হার বেশি এবং এরা ইন্ডিপেন্ডেন্টও।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close