শাহজাহান সাজু

  ১১ জুন, ২০২১

ক্ষতি পোষাতে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

* রপ্তানিমুখী শিল্পে ৫ হাজার কোটি * ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পে ৪০ হাজার কোটি * ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পে ২০ হাজার কোটি

মহামারি কোভিড-১৯ এর অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার ২৩টি আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নিয়েছে সরকার। যা জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত ইডিএফের (এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) সুবিধা বাড়ানো, চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ সম্মানী ইত্যাদি। সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪) এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মার্চের প্রথমার্ধে শুরু কোভিড-১৯ মহামারি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষের দিকে রাজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ ব্যাপক হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে। কারণ মহামারি মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছিল। তাই এ সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনীতির ওপর কোভিড-১৯ এর বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সরকার ২০২০ সালের মে মাসের প্রথম দিকে একটি সামগ্রিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি প্রণয়ন করে। যাতে চারটি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

------
প্রথম কৌশলটি হলো সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা। ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় (প্রায় ৩৫%) বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ ছিল। তবে বিদেশ সফর ও অন্যান্য অনুৎপাদনশীল ব্যয় হ্রাস করা হয়েছে। মূলত অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কৌশলটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিম্ন সুদে শিল্প ও সেবা খাতকে ঋণ সুবিধা প্রদান করা। এর উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করা, চাকরির বাজারকে শক্তিশালী করা এবং উদ্যোক্তাদের দেশে এবং বিদেশে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করা। তৃতীয় কৌশলটি ছিল অতি দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো। এ কৌশলের লক্ষ্য হলো মহামারির প্রাদুর্ভাবে হঠাৎ বেকার হয়ে পড়া এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদান। চতুর্থ এবং শেষ কৌশলটি হলো বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়ানো। তবে এ কৌশল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে মুদ্রাস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়, এসব কৌশল বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সরকার ২০২০ সালের মে মাসে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণের মাধ্যমে একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরে সরকার এ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজের আকার এবং পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করেছে। মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার এ পর্যন্ত ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার (জিডিপির ৪.২%) ২৩টি আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণ করেছে।

নীতি বিবৃতিতে বলা হয়, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ তহবিলের অধীনে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেছে। কারখানা মালিকরা যাতে তাদের কর্মীদের বেতন দিতে পারে সেজন্য সুদমুক্ত ঋণ হিসাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই তহবিল বিতরণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো তাদের অপারেটিং কমিশন হিসাবে ঋণ বিতরণের পরিমাণের মাত্র ২ শতাংশ চার্জ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রধান প্যাকেজের অধীনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বার্ষিক ৯ শতাংশ সুদের হারে ঋণ প্রদানের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ৪.৫ শতাংশ সুদ প্রদান করছে এবং বাকি ৪.৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে সরকার প্রদান করছে। ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। যার অধীনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বার্ষিক ৯ শতাংশ সুদে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদান করছে। এর মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ৪ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে এবং বাকি ৫ শতাংশ সরকার সুদ ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করছে। স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণের জন্য ৫ লাখ টন চাল ও ১ লাখ টন গম বরাদ্দ করা হয়েছে যা ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমতুল্য। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য ১ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এই কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীরা হলো লকডাউনের কারণে সাময়িকভাবে আয় হারানো জনগোষ্ঠী। দেশের সর্বাপেক্ষা দারিদ্র্যপীড়িত ১২২টি উপজেলায় বয়স্কভাতা এবং বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের জন্য ভাতা কর্মসূচির আওতায় শতভাগে উন্নীত করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ৮১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গৃহহীন মানুষের জন্য গৃহনির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। সেজন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত ইডিএফের (এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) সুবিধা বাড়ানোর জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স প্রকল্পে ৫ হাজার কোটি টাকা, চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ সম্মানী ১০০ কোটি টাকা, স্বাস্থ্যবিমা এবং জীবন বিমার জন্য ৭৫০ কোটি টাকা, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয়ের জন্য ৭৭০ কোটি টাকা, কৃষি কাজ যান্ত্রিকীকরণের জন্য ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, কৃষি ভর্তুকি জন্য ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, নিমন আয়ের পেশাজীবী কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা, কর্মসৃজন কার্যক্রমের (পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, আনসার ভিডিপি ব্যাংক এবং পিকেএসএফের মাধ্যমে) জন্য ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা, বাণিজ্যক ব্যাংকগুলোর এপ্রিল-মে/২০২০ মাসে স্থগিতকৃত ঋণের আংশিক সুদ মওকুফ বাবদ সরকারের ভর্তুকিতে ২ হাজার কোটি টাকা, এসএমই খাতের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা, তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের সহায়তা বাবদ এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ৮ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য হাজার ৫০০ কোটি টাকা, বয়স্কভাতা এবং বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা ১৫০ উপজেলায় সম্প্রসারণ বাবদ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ২য় পর্যায়ে লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে নগদ অর্থ বিতরণের জন্য ৯৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close