শেখ হাসিনা : সংগ্রামে দূরদর্শী, লক্ষ্যে অনন্য

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

অসীম এ মহাবিশ্ব। বিপরীতে মর্ত্যরে এই পৃথিবী তার কাছে বিন্দুমাত্র। আর নশ্বর পৃথিবীর তুলনায় মানুষ আরো তুচ্ছ। তবে ক্ষণজন্মা এই মানুষই তার কীর্তির মধ্য দিয়ে অর্জন করে অমরত্ব। সীমার মাঝে হয়ে ওঠে অসীম। বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের মধ্যে একজন। ষড়যন্ত্রের রক্তাক্ত বাধা পেরিয়ে তিনি সদা দীপ্ত তার কর্মে, লক্ষ্যে অনন্য। চার দশকের পথচলায় জেল-জুলুমের সঙ্গে বন্দুক তাক করা হয়েছে তার দিকে, সন্ত্রাসীর বোমা-গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বারবার। তবু তিনি ছুটে চলেছেন লক্ষ্য অর্জনে। অনির্বাণ শিখা হয়ে বাঙালির সংগ্রামে-আন্দোলনে, স্বপ্নে এবং প্রত্যাশায় জ্বলছেন দিন-রাত। বাঙালি ও বাংলার এই দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতার ৭৪তম জন্মদিন আজ। আওয়ামী লীগ সভাপতি তিনি। তিনি বিশ্বশান্তিরও অগ্রদূত।

গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীতীরের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা। দাদা শেখ লুৎফর রহমান ও দাদি সাহেরা খাতুনের আদরের নাতনি শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে টুঙ্গিপাড়ায়। শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেলসহ তারা পাঁচ ভাইবোন। তবে শেখ হাসিনা ও রেহানা ছাড়া কেউই জীবিত নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে পিতা বঙ্গবন্ধু এবং মাতা ফজিলাতুন নেছাসহ সবাই ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত হন।

শিক্ষাজীবন : শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালায়। ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হলে পরিবার ঢাকায় নিয়ে আসেন। তখন ঢাকার রজনী বোস লেনে ভাড়া বাড়িতে উঠেন তারা। বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হলে মিন্টো রোডের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। শেখ হাসিনাকে টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দিরে ভর্তি করা হয়; যা এখন শেরেবাংলা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে খ্যাত। পরে ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। ওই বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শেখ হাসিনা ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে পড়ার সময় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য এবং রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা পূর্ববাংলায় অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করে। শাসকগোষ্ঠী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। তার পরিবারের ওপর নেমে আসে দুঃখ-যন্ত্রণা। এই ঝড়ো দিনেই বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে ১৯৬৮ সালে পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়।

রাজনীতির পথে যেভাবে : বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নিহত হওয়ার আগে ছোট বোন শেখ রেহানাসহ শেখ হাসিনা ইউরোপ যান। সেখানেই তিনি বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবর পান। তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরার পরিবেশ না থাকায় তিনি ইউরোপ ছেড়ে স্বামী-সন্তানসহ ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পরে ওই বছরের ১৭ মে তিনি মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে তার ৪০ বছর পূর্ণ হবে।

১৯ বার হত্যাচেষ্টা : দেশে ফেরার পর থেকে কমপক্ষে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয় তাকে। প্রথম ১৯৮১ সালের ১৭ মে। এরপর ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রামে। ওইদিন তার গাড়িবহরে গুলি করা হলে ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন। একই বছরের ১৫ আগস্ট ও ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর গ্রিন রোডের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনকালে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদীতে ট্রেনে গুলিবর্ষণ করে তাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রাসেল স্কোয়ারে আওয়ামী লীগের জনসভায় বোমা হামলা করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভার কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতু এলাকায় যাওয়ার কথা ছিল শেখ হাসিনার। ঘাতকচক্র সেখানে শক্তিশালী বোমা পুঁতে রেখেছিল। ২০০২ সালের ৪ মার্চ নওগাঁয় শেখ হাসিনার গাড়িতে হামলা চালানো হয়। একই বছর ২৯ সেপ্টেস্বরে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালায়। একই বছর ৩০ আগস্ট শেখ হাসিনা সাতক্ষীরার চন্দনপুর ইউনিয়নের হিজলি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার ধর্ষিতা স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে তার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়।

২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে ঘাতকের বুলেট থেকে শেখ হাসিনা রক্ষা পান। একই বছর তাকে হত্যার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা করা হয়। এতে ২৪ জন নিহত হন।

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বে দেশকে একটি রোল মডেল হিসেবে পরিচিত করেছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনেও তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে হয়েছেন প্রশংসিত। এ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্যে স্বনির্ভরতা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, আইসিটি এবং এসএমই খাতে এসেছে ব্যাপক সাফল্য।

গত সাড়ে ছয় মাস শেখ হাসিনা এক দিনের জন্যও বসে থাকেননি। করোনা মোকাবিলা করে মানুষের জীবন-জীবিকা দুটোই সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।

পুরস্কার : উন্নয়নের পাশাপাশি শেখ হাসিনার ঝুলিতে জমেছে অনেক অর্জন। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ৩৯টি সম্মাননা ও পদক।

প্রধানমন্ত্রিত্বের রেকর্ড : ১৯৯৬ সালে প্রথম, ২০০৮ সালে দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালে তৃতীয় এবং ২০১৮ সালে চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা থাকার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।

লেখালেখি : শিল্প সংস্কৃতি ও সাহিত্য অন্তপ্রাণ শেখ হাসিনা লেখালেখিও করেন। তার লেখা এবং সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি। প্রকাশিত অন্যতম বইগুলো হচ্ছে শেখ মুজিব আমার পিতা, সাদা কালো, ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র্য দূরীকরণ, আমাদের ছোট রাসেল সোনা, আমার স্বপ্ন আমার সংগ্রাম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বিপন্ন গণতন্ত্র, সহেনা মানবতার অবমাননা, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি, সবুজ মাঠ পেরিয়ে ইত্যাদি।

 

 

"