কাইয়ুম আহমেদ

  ১১ মে, ২০১৮

বাংলাদেশের মহাকাশ জয়

বহুপ্রতীক্ষিত আরেকটা স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল। মহাকাশ জয় করতে পৃথিবী ছাড়ল দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। স্বাধীনতা অর্জনের পর যে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার; সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই শুরু হলো বাংলাদেশের মহাকাশ জয়ের স্বপ্নযাত্রা। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগান নিয়ে কক্ষপথের দিকে ছুটল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। আর এর মধ্য দিয়ে অসীম মহাশূন্যেও পৌঁছে গেল বঙ্গবন্ধুর নাম। ৫৭তম স্যাটেলাইট সদস্য দেশের তালিকায় নাম লেখালো বাংলাদেশ।

এদিকে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেপ ক্যানাভেরালে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি জড়ো হন। এর আগে একসঙ্গে এত বাংলাদেশিকে কখনই দেখেনি মার্কিনরা। বাংলাদেশিদের পদভারে মুখর কেপ ক্যানাভেরালের নাসার কেনেডির স্পেস সেন্টার ও পার্শ্ববর্তী এলাকা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি অন্য দেশকে স্যাটেলাইট ভাড়া দিয়ে আয় করাও সম্ভব হবে। কৃত্রিম এই উপগ্রহের মাধ্যমে দেশের টেলিযোগাযোগসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে থাকবে নিত্য নতুন সুবিধা। টেলিভিশন ও বেতার সম্প্রচার, ইন্টারনেট সেবাদান, ভি-স্যাটসহ ৪০ ধরনের সেবা দেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটি সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলি যোগাযোগব্যবস্থা বহাল রাখবে। এর আগে এসব সেবার জন্য দেশের টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিঙ্গাপুর, হংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট ব্যবহার করত। আর এসব সেবা এখন নিশ্চিত করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারে অন্য দেশের ওপর আর নির্ভরশীল হতে হবে না আমাদের। বর্তমানে দেশের সব স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া করে সম্প্রচার চালাচ্ছে। ফলে ভাড়া বাবদ বছরে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে অনেক অর্থ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি অন্য দেশকে স্যাটেলাইট ভাড়া দিয়ে আয় করাও সম্ভব হবে।

দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো সম্ভব। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-রিসার্চ, ভিডিও কনফারেন্স প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভালো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাবে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। বাংলাদেশ যখন তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের তিন বছর আগে মহাকাশ যাত্রার মাইলফলক অর্জন করল; ঠিক এর ৬১ বছর আগে মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৫৭ সালে উৎক্ষেপিত সেই কৃত্রিম উপগ্রহটির নাম ছিল স্পুটনিক-১। আশ্চর্যজনক হলেও মহাকাশে ইতিহাস তৈরি করা সেই নামটির সঙ্গেই যুক্ত হলো বাংলাদেশ। কেননা ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণ এবং তা কক্ষপথে রাখার জন্য যে উপগ্রহ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে; সেই কোম্পানির নামও স্পুটনিক। তাদের কাছ থেকেই প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় ১৫ বছরের জন্য কক্ষপথ (অরবিটাল সøট) কেনা হয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশ আজ বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক ক্ষেত্রেই তার অর্জন ঈর্ষণীয়। সর্বশেষ মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানুষ ও মানবতার নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।

তথ্যও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেছেন, সম্প্রচার, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। বর্তমানে বাংলাদেশের সবগুলো টিভি চ্যানেল তাদের সম্প্রচারের জন্য বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর টিভি চ্যানেলগুলোর বিদেশ-নির্ভরতা যেমন কমে আসবে তেমনি সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা। আমরা আমাদের দেশের সব টিভি চ্যানেলের চাহিদা মিটিয়ে আমাদের স্যাটেলাইট দেশের টিভি চ্যানেলের জন্য ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করতে পারব। আমাদের স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। আমাদের বর্তমানে যে চাহিদা রয়েছে তা পূরণ করেও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে যে, অনন্ত ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশিদের জন্য ভাড়া দেব। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা যেখানে ফাইবার অপটিক দিয়ে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া কঠিন, সেসব জায়গায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে খুব সহজেই পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি। পলক বলেন, এর বাইরেও যোগাযোগ স্যাটেলাইট তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। দুর্যোগের সময় ভূমি কেন্দ্রিক যোগযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকলেও স্যাটেলাইট তখন কার্যকর থাকে। শুধু তাই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে-পরেও স্যাটেলাইট যোগাযোগ খুবই ব্যবস্থা খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এই উদ্যোগের জন্য প্রতিমন্ত্রী পলক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন।

এর আগে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ উপলক্ষে গত সোমবার ফ্লোরিডা গেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম (সাবেক টেলিকম প্রতিমন্ত্রী), তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ।

উৎক্ষেপণস্থল ফ্লোরিডায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়সহ সব মিলিয়ে সরকারের ৪২ সদস্যর একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন।

স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ যান বা রকেট ফ্যালকন-৯ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে মহাকাশে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত অরবিট প্লটে স্থাপন করে। ফ্রান্সের কান টুলুজ ফ্যাসিলিটিতে নির্মিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ইতোমধ্যে ফ্রান্স থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কার্গো বিমানে করে উৎক্ষেপণস্থল ফ্লোরিডার অরল্যান্ডের ক্যাপ ক্যানাভেরালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থেলেস এলেনিয়া স্পেস বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি নির্মাণ করেছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে প্রাথমিক এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড স্টেশনের নির্মাণকাজও চূড়ান্ত হয়েছে। মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর এটি পরিচালনা, সফল ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যত্রম সম্পাদনের জন্য ইতোমধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। নতুন এ কোম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি দেশে ব্যবহারের জন্য এবং ২০টি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। এ ছাড়া নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকায় বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতার অবসান হবে। টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-গবেষণা, ভিডিও কনফারেন্স, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist