ড. আবদুল আলীম তালুকদার

  ১৫ অক্টোবর, ২০২১

ফিরে দেখা

নেশা নিরোধে শরয়ী বিধান

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির পাশাপাশি আরো একটি সমস্যা মহামারির মতোই প্রকট আকার ধারণ করেছে তা হলো মাদকাসক্তি বা নেশা; যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজব্যবস্থা এমনকি রাষ্ট্র ধ্বংসেরও একটি অশনিসংকেত। আমাদের দেশে কমবেশি সব বয়সি লোকের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও তা ইদানীং কিশোর ও যুব সমাজ তথা তরুণ-তরুণীদের মাঝে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে; যা মানবতার জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ।

ইসলামে নেশা বা মাদকদ্রব্য গ্রহণকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, যেসব দ্রব্য গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও আসক্তিতে পরিণত হয়, মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে, মত্ততা জন্মায়, বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় তা-ই হচ্ছে মাদক অর্থাৎ যা নেশা সৃষ্টি করে তা-ই মাদক।

এ প্রসঙ্গে কোরআনুল কারিমের সুরা মায়িদার ৯০ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মোমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরগুলো এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক। যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, রাসুল (সা.) মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০ ধরনের লোককে অভিসম্পাত করেছেন। তারা হলো- মদ প্রস্তুতকারী, পরামর্শদাতা, পানকারী, বহনকারী, যার জন্য বহন করা হয়, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, মূল্যভোগী, ক্রেতা এবং যার জন্য ক্রয় করা হয়’- (জামে তিরমিজি)।

ইসলামি ভাষ্য মতে, নেশাজাতীয় দ্রব্য বা মদ্যপান হলো মানুষের ফিতরাতের বিপরীতমুখী কাজ। যা মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দিয়ে পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত করে। এ মর্মে সুরা বাকারার ২১৯ নং আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘তারা আপনাকে মদ, জুয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করলে আপনি বলুন উভয়টিতে রয়েছে মহাপাপ।’ এ ছাড়া নবি (সা.) বলেছেন, ‘মাদকগ্রহণকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (ইবনে মাজাহ)।

মরণঘাতী মাদকদ্রব্য বা নেশা শুধু যে ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে তা না বরং এর বিরূপ প্রভাব পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপরও ঝেঁকে বসে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে কলুষিত করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে এই নেশা। আমরা অত্যন্ত অসহায়ের মতো লক্ষ্য করছি যে, মাদকের বিষাক্ত ছোবল প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে দিচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণ প্রতিভাকে। মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে সমাজে হরহামেশা বেড়েই চলেছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, ঝগড়া-বিবাদের মতো চরম অস্থিরতা; তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে পাপাচার-দূরাচার, অপরাধ-অপকর্ম, পারিবারিক কলহ-অশান্তি, সামাজিক বিশৃঙ্খলতা, আত্মিক কলুষতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের বিচ্যুতি ও বেহায়াপনা।

হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দ্রব্যের বেশি পরিমাণ (পান করলে) নেশার সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও (পান করা) হারাম’- (ইবনে মাজাহ ও তিরমিজি)। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নেশাজাতীয় দ্রব্য এক ঢোক পরিমাণ পান করাও হারাম।

বর্তমানে প্রচলিত নেশাজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে অন্যতম হলো হেরোইন, ফেনসিডিল, মরফিন, পেথেড্রিন, এলএসডি, সীসা, কোকেন, গাঁজা, তাড়ি, নানা ব্র্যান্ডের দেশি-বিদেশি মদ, আফিম, ইয়াবা, মারিজুয়ানা, রেকটিফাইড স্পিরিট, আইকা গাম ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ; যার দ্বারা যুব-তরুণ সমাজ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। এই নেশাজাত দ্রব্য পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মোতাবেক এসব নেশাদায়ক দ্রব্যসহ আরো যেসব জিনিস গ্রহণ করলে মানুষ নেশায় আসক্ত হয়, তা গ্রহণ করা হারাম। এতে কবিরা গুনাহ হয়। যার গুনাহ খালেছ নিয়তে তাওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না।

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে ১০টি বিষয়ে উপদেশ প্রদান করেছেন, (তন্মধ্যে একটি হলো) ‘কখনো শরাব তথা মদ পান করবে না। কেননা, তা সকল প্রকার অশ্লীল কর্মের উৎস’ (আহমদ)।

তামাকজাত দ্রব্যের (বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, তামাক পাতা, গুল ইত্যাদি) নিকোটিন মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের সংস্পর্শে এলে নেশার সৃষ্টি করে, অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। সেজন্য এসবে কেউ আসক্ত হলে সে তা সহজে ছাড়তে পারে না। তা ছাড়া তামাকজাত নানা দ্রব্য গ্রহণের কারণে ফুসফুসের নানা রোগ, ক্যানসার, হার্টের বিভিন্ন জটিলতাসহ স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা জীবন বিধ্বংসী ও বিপুল পরিমাণে অর্থের অপচয়কারী। তাই বর্তমান সময়ে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, এসব মাদকদ্রব্য তথা নেশা গ্রহণ করা সুস্পষ্ট হারাম।

হাদিসে কারিমায় নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘প্রতিটি নেশাদার বস্তুই মাদক আর সব মাদকদ্রব্যই হারাম’- (সহিহ মুসলিম, মিশকাত শরিফ)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা মদ্যপান করবে না। কেননা ইহা সব মন্দের চাবিকাঠি’- (ইবনে মাজাহ)।

মাদকের নেশার ভয়াবহতা সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘ব্যাভিচারে লিপ্ত থাকা অবস্থায় ব্যাভিচারীর ঈমান থাকে না, মদ্যপান করার সময় মদ্যপানকারীর ঈমান থাকে না এবং চোর চৌর্যবৃত্তি করার সময় তার ঈমান থাকে না’- (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

তা ছাড়া মিরাজের রাতে নবী কারিম (সা.) কে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি দেখানো হয়েছিল। সেখানে মাদক তথা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণকারীদেরও শাস্তি দেখানো হয়েছে। সেখানে তিনি লক্ষ্য করেন যে নেশাগ্রস্ত লোকেরা জাহান্নামিদের শরীর থেকে নির্গত দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পুঁজ পান করছে’- (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

সুতরাং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী যা কিছু মস্তিষ্কের সংস্পর্শে এসে জ্ঞান-বুদ্ধিকে বিপর্যস্ত ও নেশাগ্রস্ত করে তোলে তা-ই হারাম। চাই তা তরল হোক, বায়বীয় হোক কিংবা কঠিন পদার্থই হোক না কেন। মহান আল্লাহ মানব সম্প্রদায়কে মরণঘাতী নেশার হাত থেকে পরিত্রাণ দান করে সুন্দর এই পৃথিবীর বুকে সুস্থ-সবল জীবনযাপন করার তওফিক দান করুন।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close