নাহিদ হাসান রবিন, শেরপুর (বগুড়া)

  ৮ ঘণ্টা আগে

দইয়ের বিড়া তৈরিতে স্বাবলম্বী প্রান্তিক নারী

উত্তরের জনপদ বগুড়া মানেই জিভে জল আনা সুস্বাদু দইয়ের সুবাস। আর মাটির তৈরি সেই ঐতিহ্যবাহী দইয়ের হাঁড়ি সযতনে যে বস্তুটির ওপর বসে থাকে, তা হলো খড়ের তৈরি গোলাকার ‘বিড়া’। একসময় যা কেবলই কৃষকের মাঠের ফেলে দেওয়া শুকনো খড় ছিল, আজ তা শেরপুর উপজেলার শত শত নারীর জীবনে সোনালি স্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়েছে। উপজেলার ফুলবাড়ি, শিবপুর ও খামারকান্দি, জয়নগরসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রান্তিক নারীদের নিপুণ হাতের জাদুকরী ছোঁয়ায় প্রাণ পাচ্ছে এই খড়ের বিড়া, আর সেইসঙ্গে বদলাচ্ছে তাদের জীবনযাত্রা।

ভোর থেকে শুরু হয় গ্রামীণ নারীদের প্রাত্যহিক ব্যস্ততা। রান্না, উঠান লেপা, গবাদিপশু পালন আর সংসারের হাজারো ঝক্কি সামলে দুপুরের দিকে যখন কিছুটা অবসর মেলে, তখন তারা দলবেঁধে বসে যায় খড় নিয়ে। বাড়ির বারান্দায় বা গাছের ছায়ায় পাটি বিছিয়ে চলে তাদের এই শৈল্পিক কর্মযজ্ঞ। শুকনো খড়কে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে অত্যন্ত নিপুণ দক্ষতায় তারা তৈরি করেন একেকটি শক্ত বিড়া। তাদের আঙুলের প্রতিটি প্যাঁচের সঙ্গে যেন বোনা হয় আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অদম্য বাসনা। খড়ের খসখসে শব্দ, চুড়ির রিনঝিন আর নারীদের সুখ-দুঃখের গল্পের ছন্দে সেখানে তৈরি হয় এক অপূর্ব গ্রামীণ আবহ। ফেলে দেওয়া সময়ের এই সঠিক ব্যবহারই এখন তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

?এই ক্ষুদ্র কুটির শিল্পটি শুধু তাদের অবসর কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির এক নীরব চালিকাশক্তি। ফুলবাড়ী গ্রামের সফল বিড়া ব্যবসায়ী মরিয়মের জীবনের গল্পটি এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মরিয়ম নিজের উদ্যোগে এই বিড়া সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যবসা করে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় করছেন। কেবল মরিয়ম নন, যে নারীরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে কেবল বিড়া তৈরি করে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন, তারাও মাসে অনায়াসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ঘরে তুলছেন। এখন আর তাদের ছোটখাট প্রয়োজনের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে পরিবারের বাড়তি চাহিদা মেটাতে তাদের এই ঘামঝরানো আয় রাখছে অভাবনীয় ভূমিকা।

?এই বিড়া নিজ জেলার চাহিদা মেটানোর পর সিরাজগঞ্জ, রংপুর, বরিশাল, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলার চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। খড়ের মতো একটি অতি সাধারণ উপাদানকে পুঁজি করে শেরপুরের এই নারীরা প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা আর অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো পরিবেশেই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। তাদের হাতের ছোঁয়ায় মূল্যহীন খড় হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী হওয়ার জাদুকরী কাঠি। বগুড়ার দইয়ের স্বাদ যেমন দেশজুড়ে সমাদৃত, ঠিক তেমনি দইয়ের হাঁড়ির নিচে সযতনে রাখা এই বিড়াগুলোও আজ বহন করে চলেছে বাংলার অদম্য নারীদের নীরব সংগ্রামের এক মধুর সাফল্যগাঁথা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়