আরিফ খান, বেড়া-সাঁথিয়া (পাবনা)
কষ্টের জীবন
শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় হার না মানা মোক্তার হোসেন

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এক পায়ে ভর দিয়ে চলা অদম্য এক মানুষের জীবন সংগ্রাম এলাকায় মনোবল ও টিকে থাকার লড়াইয়ের বাস্তব উদাহরণ। এটি আমাদের শেখায় যে, কঠিন পরিস্থিতি কখনো মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে থামাতে পারে না। এমন উদাহরণ পাবনার বেড়া পৌরসভার শাহপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মোক্তার হোসেনের জীবন। তার বয়স এখন ৬৫ বছর। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানেন তিনি।
একটি পা, একটি সাইকেল আর অসীম সাহস নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে ছুটে চলেছেন মোক্তার হোসেন। শরীরের একটি পা অকার্যকর, একটি হাতও স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল। তবুও জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন, সেই লাঠি সাইকেলের সঙ্গী করে এক পায়ে চালিয়ে যান জীবনের পথ। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে আসছেন তিনি।
মোক্তার হোসেনের জীবন যেন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক দীর্ঘ গল্প। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য তার নিত্যসঙ্গী। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে তার ডান পা অকার্যকর হয়ে যায়। একইসঙ্গে তার ডান হাতও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই বয়সে অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন মোক্তারকে শিখতে হয়েছে কীভাবে একটি পা নিয়েই জীবনের সঙ্গে চলতে হয়।
হাঁটা-চলার জন্য কোনো ক্র্যাচ কেনার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। তাই একটি লাঠিই হয়ে ওঠে তার চলার ভরসা। সেই লাঠিতে ভর দিয়েই শুরু হয় তার স্কুলে যাওয়া। প্রতিবন্ধকতা কখনো তার পড়াশোনার আগ্রহ কমাতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ক্লাসে তার রোল থাকত সেরা দশের মধ্যে।
স্বপ্ন ছিল বড়। পড়াশোনা শেষ করে ভালো কোনো সরকারি চাকরি করবেন, পরিবারকে অভাব থেকে মুক্ত করবেন। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা তার সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
যখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র, তখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে তাদের পরিবার থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে যান। তখন সংসারে ছিল তিন ভাই ও আট বোন। বাবার সহযোগিতা না থাকায় সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাদের ওপর। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই মোক্তার হোসেনকে সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়।
বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। স্বপ্ন থেমে যায়, কিন্তু দায়িত্ব থামেনি। সংসার চালাতে তিনি ছোট একটি মুদি দোকান শুরু করেন। দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আট বোনের বিয়ে দেওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা, অভাবের সঙ্গে লড়াই করা, সবই করতে হয়েছে তাকে।
মুদি দোকান চালানোর পাশাপাশি একসময় আশপাশের দু-একজন শিক্ষার্থীকে পড়ানো শুরু করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র ছিলেন বলে পড়ানোর প্রতি তার আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল। ধীরে ধীরে এলাকায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দোকান ছেড়ে পুরোপুরি প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন।
তবে এই পথও সহজ ছিল না। তিনি যেহেতু দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, তাই মূলত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ছিল দরিদ্র পরিবারের। ফলে আয়ও ছিল সীমিত।
বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লার বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতে হতো তাকে। লাঠিতে ভর দিয়ে এক পায়ে হাঁটা তার জন্য কষ্টকর ছিল। রিকশায় যাতায়াত করার সামর্থ্যও ছিল না। তখনই একটি সাইকেল জোগাড় করেন তিনি। শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম।
এক পায়ে সাইকেল চালানো শেখা তার জন্য ছিল কঠিন পরীক্ষা। প্রথমদিকে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে বহু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু চেষ্টা আর আত্মবিশ্বাসের কাছে হার মানে কঠিন বাস্তবতাও। ধীরে ধীরে তিনি আয়ত্ত করেন এক পায়ে সাইকেল চালানোর কৌশল।
এরপর থেকে সাইকেলই হয়ে ওঠে তার চলার সঙ্গী। প্রায় ৪৫ বছর ধরে লাঠি সঙ্গে নিয়ে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন তিনি। সাইকেল চালানোর সময় লাঠিটি থাকে তার পাশে, আর হাঁটার সময় সেই লাঠিই আবার তার অবলম্বন।
মোক্তার হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছি। পড়াশোনা করে ভালো কিছু করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সংসারের দায়িত্বের কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে কখনো থেমে যাইনি। যত দিন শরীর চলে, তত দিন শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে যেতে চাই। আমার কষ্টের জীবন থেকে যদি কেউ সাহস পায়, সেটাই আমার বড় পাওয়া।’
প্রাইভেট পড়ানোর আয় দিয়েই চলে মোক্তার হোসেনের সংসার। আগে মাসে আট থেকে দশটি বাড়িতে পড়াতে পারলেও বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো পারেন না। বর্তমানে পাঁচণ্ডছয়টি বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান। টিউশনির জন্য নির্দিষ্ট কোনো বেতন তিনি ঠিক করে দেন না। যে পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী যে যতটুকু দেয়, সেটিই হাসিমুখে গ্রহণ করেন। এভাবেই মাসে তার আয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই কোনোরকমে চলে তার সংসার।
মোক্তার হোসেন থাকেন একটি জীর্ণ টিনের ঘরে। অভাব এখনো তার জীবনের সঙ্গী। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। সারা জীবন প্রাইভেট পড়িয়ে জমানো টাকা এবং ধারদেনা করে ছেলেকে সিঙ্গাপুরে শ্রমিকের কাজে পাঠিয়েছেন। মোক্তার হোসেনের স্ত্রী হেলেনা খাতুন বলেন, ‘আমাদের সংসারে অভাব সবসময়ই ছিল। কিন্তু আমার স্বামী কখনো হাল ছাড়েননি। শরীরের কষ্ট, সংসারের চিন্তা সব কিছু নিয়েই তিনি দিনের পর দিন কাজ করে গেছেন। তার এই পরিশ্রম নিয়ে আমি গর্ব করি।’
মোক্তার হোসেনের ছাত্রদের একজন বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মোক্তার স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েছি। তার কাছ থেকে শুধু পড়াশোনা নয়, পরিশ্রম ও সাহসের শিক্ষাও পেয়েছি। নিজের জীবনের অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও তিনি অন্যের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করে চলেছেন। একটি পা, একটি সাইকেল আর অসীম মনোবল নিয়ে তার এই পথচলা আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষকের সংগ্রামের গল্প নয়, এটি হার না মানা জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।’
"






































