আহনাফ তিহামী, তিতাস (কুমিল্লা)
স্থাপত্য
যে মসজিদে আজান হয়নি পড়া হয়নি নামাজ!

কুমিল্লার সদর উপজেলার গোমতী নদীর উত্তর তীরঘেঁষা মাঝিগাছা গ্রামে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি রহস্যঘেরা প্রাচীন মসজিদ। লোকমুখে এটি পরিচিত ‘নটীর মসজিদ’ নামে। জনশ্রুতি রয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই সম্ভবত একমাত্র মসজিদ, যেখানে কখনো আজান দেওয়া হয়নি এবং কোনো দিন জামাতে নামাজ আদায় করা হয়নি।
ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা দ্বিতীয় ধর্ম মানিক্যের শাসনামলে, অর্থাৎ ১৭১৪ থেকে ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মসজিদটি নির্মিত হয়। এর নির্মাতা ছিলেন নূর জাহান নামে এক নারী, যিনি একসময় ত্রিপুরা রাজদরবারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নর্তকী বা বাইজি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
জনশ্রুতি অনুসারে, কিশোরী বয়সে সাপে কাটার পর মুমূর্ষু অবস্থায় নূর জাহানকে কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরে ত্রিপুরা রাজদরবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। রাজদরবারের প্রধান নর্তকী মেনেকার তত্ত্বাবধানে তিনি নাচ-গান শেখেন এবং ধীরে ধীরে রাজদরবারের অন্যতম সেরা শিল্পীতে পরিণত হন।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর রাজদরবারে কাটানোর পর মধ্যবয়সে নিজ গ্রাম মাঝিগাছায় ফিরে আসেন নূর জাহান। বিদায়ের সময় মহারাজার কাছ থেকে তিনি নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও কয়েক একর জমি পান। গ্রামে ফিরে নিজেকে এক জমিদারের বিধবা স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন এবং দরিদ্র মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
স্থানীয়দের মতে, অতীত জীবনের জন্য নূর জাহানের মধ্যে ছিল গভীর অনুশোচনা। এক আলেমের পরামর্শে পাপ মোচনের আশায় তিনি নিজ অর্থায়নে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। নির্ধারণ করা হয় প্রথম জামাতে নামাজ আদায়ের দিনও। তবে নামাজ শুরুর আগে ওই আলেম উপস্থিত মুসল্লিদের সামনে নূর জাহানের অতীত পরিচয় প্রকাশ করে দেন। তখন উপস্থিত মুসল্লিরা মসজিদটিকে ‘নটীর মসজিদ’ বলে আখ্যায়িত করে সেখানে নামাজ আদায়ে অস্বীকৃতি জানান। সিদ্ধান্ত হয়, নর্তকীর অর্থে নির্মিত ওই মসজিদে কেউ নামাজ পড়বেন না।
এরপর থেকেই মসজিদটিতে আর কখনো আজান দেওয়া হয়নি এবং কোনো দিন জামাতে নামাজও আদায় করা হয়নি বলে প্রচলিত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নূরে আলম ও মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেও তারা একই কাহিনি শুনে আসছেন। তাদের দাবি, মসজিদটি নির্মাণের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে কখনো আজান দেওয়া হয়নি কিংবা নামাজ আদায় করা হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সামাজিক অপমান ও প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পেরে নূর জাহান মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একাধিক প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, তিনি আত্মহত্যা করেন এবং মসজিদের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। তবে অন্য একটি মত অনুযায়ী, তিনি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি। এদিকে ঝোপঝাড়, অবহেলা ও স্থানীয় দখলের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়েছে একগম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন মসজিদ। আয়তাকার পরিকল্পনায় নির্মিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ৪ মিটার, প্রস্থ ৫ দশমিক ১ মিটার এবং দেয়ালের পুরুত্ব ৮২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি করে প্রবেশপথ। নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ইট, চুন ও সুরকি। পশ্চিম দেয়ালের একমাত্র মেহরাবে এখনো টিকে আছে নান্দনিক অলংকরণের চিহ্ন, যা মোগল স্থাপত্যশৈলীর স্মৃতি বহন করছে। ড. নাহিদ সুলতানা বলেন, মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে ইতিহাসের এই অনন্য স্থাপনাটি একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা ‘নটীর মসজিদ’ আজও বহন করে এক নারীর অনুশোচনা, সমাজের প্রত্যাখ্যান এবং ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ের স্মৃতি। তবে মসজিদটিতে কখনো আজান বা নামাজ না হওয়ার বিষয়টি মূলত জনশ্রুতি ও স্থানীয় লোককথার উপর ভিত্তি করে প্রচলিত এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনো নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।
"









































