বিশেষ প্রতিবেদক
শিবালয়ের যমুনা
ইজারা সীমানার বাইরে গিয়ে বালু লুট
* বিরোধে একজনকে গুলি করে হত্যা * নদী ভাঙনের আশঙ্কা এলাকাবাসীর

মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনা নদীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বালুখেকোরা। ইজারা নিয়েছেন এক জায়গায়, বালু উত্তোলন করছেন আরেক জায়গা থেকে। ইজারার নির্ধারিত স্থানের দুই কিলোমিটার দূরে আলোকদিয়া চর ও তারখাম্বা এলাকায় সশস্ত্র পাহারায় তারা বালু লুট করছেন। এরই মধ্যে বালু উত্তোলনের বিরোধ নিয়ে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যেকোনো সময় আরো প্রাণহানি ঘটতে পারে। তাছাড়া ৪-৫টি বড় ড্রেজার দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু কাটায় নদী ভাঙনের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এদিকে টাঙ্গাইলের ভুঞাপুরে অবৈধভাবে বালু তোলায় একজনের এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জানা গেছে, শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহাল এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছে অয়ন এন্টারপ্রাইজ। স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা পরিচয়দানকারী অয়ন খানের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানের লোকজন ৪-৫টি বড় ড্রেজার দিয়ে ইজারাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আলোকদিয়া চর ও তারখাম্বা এলাকায় যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করছেন। প্রতিদিন তারা ৪৫-৫০ বাল্কহেড বালু সশস্ত্র পাহারায় লুট করছেন। প্রতিদিন ৫-৬ লাখ টাকার বালু লুট হলেও ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যমুনা নদী সময়ে-অসময়ে ভাঙে। প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অবাধে বালু উত্তোলন করায় ভাঙন আরো তীব্র হয়েছে। শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলায় প্রতিনিয়ত নদী ভাঙছে। কিন্তু বালুখেকোদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ইজারার বাইরে গিয়ে বালু কাটার বিষয়টি উঠে এসেছে অয়ন এন্টারপ্রাইজের মালিক অয়ন খানের কথায়। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, এটা তার বাবার ব্যবসা ছিল। তিনি মারা গেলে কয়েক বছর আগে তিনি (অয়ন) ব্যবসার হাল ধরেন। অয়ন স্বীকার করেন, তাদের একটি কাটার (ড্রেজার) কয়েক দিন আগে আলোকদিয়ায় বালু কেটেছিল। তখন শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার অভিযান চালিয়ে কিছু অর্থ জরিমানা করেছেন। এরপর থেকে সীমানার বাইরে তারা বালু কাটছেন না।
অয়ন খান এই প্রতিবেদককে নিউজ না করতে এবং তার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, অ্যাডভোকেট সুজাত তাদের ব্যবসা দেখভাল করছেন। মূলত তাকে সাব-ইজারা দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করারও অনুরোধ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেখানে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়েছে। ফের অভিযান চালানো হবে। কাউকে ইজারার বাইরে বালু কাটতে দেওয়া হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু আপনি বলেছেন, খোঁজখবর নিয়ে সেখানে আবার অভিযান চালানো হবে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, যমুনা নদীতে কয়েকবার অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে ফের অভিযান চালানো হবে।
বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গুলিতে নিহত ১ : শিবালয় উপজেলায় বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত মিরাজ হোসেন (৪০) উপজেলার তেওতা বালুমহালের ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বিকেল ৫টার দিকে আলোকদিয়া চরে মিরাজ হোসেন বালুমহালের ড্রেজারে বসে হিসাব-নিকাশ করছিলেন। এ সময় স্পিডবোটে করে আসা একদল লোক তাকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে হামলাকারীরা তাকে কুপিয়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শিবালয় থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মানবেন্দ্র বালো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ভূঞাপুরে একজনের কারাদণ্ড : ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে যমুনা নদী থেকে অবৈধ ও অননুমোদিতভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের দায়ে হানিফ আলী নামে এক ড্রেজার মালিককে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত হানিফ আলী উপজেলার নিকরাইল ইউনিয়নের সারপলশিয়া গ্রামের সোহরাব আলীর ছেলে। গত শনিবার দুপুরে উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের খানুরবাড়ী এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসান। তিনি জানান, সরকারি নিয়ম অমান্য করে একশ্রেণির অসাধু বালু ব্যবসায়ী প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে যমুনা নদীতে অবৈধ ও অননুমোদিতভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছিল। ভূঞাপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের সহযোগিতায় তাদের আটক করা হয়। পরে তারা দোষ স্বীকার করায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে ড্রেজার মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোনো বৈধ ও অনুমোদন যদি না থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন সবসময় সচেতন ও সচেষ্ট রয়েছে। যারা অবৈধ ও অননুমোদিত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ সময় ভূঞাপুর থানা পুলিশ ও ভূঞাপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
"







































