কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

  ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর নামেই আন্তর্জাতিক

রয়েছে উজ্জ্বল সম্ভাবনা, কিন্তু উন্নয়ন নেই, বাড়ছে ফ্লাইটের সংখ্যা

বহির্বিশ্বে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের গুরুত্ব বাড়লেও বাড়ছে না নিজ দেশে। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক মানের এ বিমানবন্দরের উন্নয়ন হচ্ছে না। সকল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঠিক কি কারণে এটি অবহেলার শিকার এ নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর মনে নানা প্রশ্ন জাগছে। এ বিমানবন্দরের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশেও আগ্রহ আছে। থাইল্যান্ড এ বিমানবন্দরটির গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এর জন্য এক সময় তৎকালীন সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু নানা প্রতিবাদের মুখে তারা পিছিয়ে যায়। ভারত সরকারও এ বিমানবন্দর ব্যবহারে আগ্রহী।

চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম ‘শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। নামেই এটা আন্তর্জাতিক। একটি রানওয়ে দিয়ে চলছে এ বিমানবন্দরটি। একটি বিমান রানওয়েতে না নামা পর্যন্ত অন্যটি আকাশে ঘুরে। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটের বিমানসহ ৮৪টি বিমান এখানে উঠানামা করে। ঢাকার পরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর হলেও তা রয়ে গেছে কাগজে-কলমে। ১৮ বছর আগে জাপান সরকারের অনুদানে এটি আন্তর্জাতিক মানের করা হলেও পরবর্তিতে আর কোনো উন্নয়ন হয়নি। রানওয়ের উন্নয়ন না হওয়ায় ঝুঁঁকি নিয়ে চলছে বিমান। বিভিন্ন সময় বিমানবন্দরের উন্নয়নের দাবি উঠলেও সরকার নির্বিকার। বিদেশি অনেকে এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ও কলকাতার কারণে এ বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক নামটি এখনও ধরে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তোলার যে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে তার কোনো প্রতিফলন নেই চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে উন্নয়নের নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। নির্মিত হয়েছে পাঁচতারকা হোটেলসহ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নামে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র। কিšুÍ অবকাঠামোর উন্নয়ন না হওয়ায় এসব এখন লোকসানে জর্জরিত। বিদেশিরা আসছে না চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম ইপিজেড কেন্দ্রিক যাদের ব্যবসা রয়েছে তারা ছাড়া আশানুরূপ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। এর প্রধান কারণ চট্টগ্রামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে বিমান যোগাযোগব্যবস্থা অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে কোনো বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি পেতে হলে নিরাপদ ও সহজভাবে ঐ বিমানবন্দরে বোয়িং-৭৭৭ মানের বিমান অনায়াসে ওঠানামা করতে হবে। বিশ্বের বিমান বন্দরগুলোকে যেসব ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে ক্যাটাগরি-৮ মান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ঝুঁকি নিয়ে বোয়িং-৭৭৭ নামানো হলেও এর ক্যাটাগরির মান উন্নত হয়নি। এ বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে ক্যাটাগরি-৭ মানে রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চট্টগ্রামের মানুষ বেশি থাকার কারণে এখানে বিভিন্ন বিদেশি এয়ারলাইনের সুপরিসর বিমান উঠানাম করছে। বেশিরভাগই বোয়িং-৭৭৭ ক্যাটাগরির বিমান। অনেকটা নির্দেশনা অমান্য করেই এ কাজটি হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বিষয়টির দ্বি-মত পোষণ করে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার উইং কমান্ডার রিয়াজুল কবির জানান, বিমানবন্দরটিতে প্রতিদিন প্রায় ৮৪টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এর মধ্যে ৯ থেকে ১১টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট উঠা নামার সময় এটিকে ক্যাটাগরি-৮ এ উন্নীত করা হয়। অর্থাৎ এসব বিমান হ্যান্ডলিং এর জন্য যা যা প্রস্ততি নেওয়ার সব নেওয়া হয়ে থাকে। তিনি বলেন, এ বিমানবন্দরটির লোক নিয়োগের যে অর্গানোগ্রাম রয়েছে তা ১৯৮২ সালের পুরোনো। পরবর্তীতে এটির কলেবর বাড়লেও আশানুরূপ নিয়োগ বাড়েনি। দৈনিক ভাতায় লোক নিয়োগ করে এটি চালানো হয়। তার উপর নিয়োগকে কেন্দ্র করে মামলা জটিলতা রয়েছে। তবে বর্তমানে সব কিছু কাটিয়ে লোক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রানওয়ে বাড়ানোর কাজ চলছে। কনসালটেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে। রাড়ার বসানো হয়ে গেছে। বাকি কাজও দ্রুত শেষ হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের পর দেশের দ্বিতীয় বিমানবন্দর হিসেবে ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের বঙ্গোপসাগরের তীরে এটি নির্মিত হয়। অভ্যন্তরীণ বিমান উঠানামার জন্য মূলত এটি ব্যবহৃত হতো। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরটি তৈরি হয়। তখন চট্টগ্রাম এয়ার ফিল্ড হিসেবে এ বিমানবন্দর পরিচিতি পায়। এরপর বিমানবন্দরটির উন্নয়নে আর কোনো কাজ হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭-৭৮ সালে ৭৬২ মিটার প্রস্থ ও তিন হাজার ৪৮ মিটার দৈর্ঘের রানওয়ে তৈরি করা হয়। ১৯৮৪-৮৫ সালে রানওয়ের আশপাশ বর্ধিত করা হয় এবং কার্পেটিং করা হয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ে বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর টামির্নাল ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করা হয়। নব্বই দশক থেকে চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ বেড়ে যায়। চট্টগ্রাম থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ঢাকা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া শুরু করলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য দাবি উঠে। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বিমানবন্দরের রানওয়ে কিছুটা উন্নয়ন করে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল শুরু হয়। বিদেশি বিমানগুলোর উঠানামার ফলে এ বিমানবন্দরের নাম বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিমানবন্দরের উন্নয়নে এগিয়ে আসে জাপান। জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘জাইকা’র ৫৭০ কোটি ব্যয়ে এ বিমানবন্দরটি আধুনিকায়ন করা হয়। অত্যন্ত সহজ শর্তে জাপান এ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের উন্নীত করে। ১৯৯৮ সালে কাজ শুরু হওয়ার পর ২০০১ সালে শেষ হয়। আধুনিক এ বিমানবন্দরটি ‘চট্টগ্রাম এম এ হান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তিতে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় এসে এ বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে ‘শাহ আমানত বিমানবন্দর’ নামকরণ করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এ বিমানবন্দরের যাত্রা শুরু হলেও স্বীকৃতি মেলে ২০১৩ সালে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি দেশের এ দ্বিতীয় বৃহত্তর বিমানবন্দর দিয়ে মালামালও পরিবহন হচ্ছে বিশ্বের নানা গন্তব্যে। বিমানবন্দরটি থেকে আন্তর্জাতিক রুটে বিমান ছাড়াও এয়ার অ্যারাবিয়া, ফ্লাই দুবাই, মালিন্দো এয়ারলাইন্স ও ওমান এয়ারে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এক সময় থাই এয়ারওয়েজ এবং তারও আগে সিল্ক এয়ারওয়েজ (সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের অঙ্গ সংস্থা) চট্টগ্রাম দিয়ে উড়োজাহাজ চলাচল করলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। তবে ভারতের কলকাতার সঙ্গে প্রতিদিন বিমান যোগাযোগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি বিমান সংস্থা প্রতিদিন এ রুটে বিমানে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। ভৌগোলিক কারণে এ বিমানবন্দরকে ঘিরে অনেক দেশের আগ্রহ রয়েছে। থাইল্যান্ড এ বিমানবন্দরকে ঘিরে বাংলাদেশে নিজস্ব ব্যবসা বাড়াতে তৎপর ছিল। তারা নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে এটি ব্যবহারের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিবাদের মুখে তারা পিছিয়ে যায়। ভারত সরকারও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের পাশাপাশি এ বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান রানওয়েটি নির্মাণ করা হয় ২০০০ সালে। প্রায় ২ হাজার ৯৪০ মিটার লম্বা রানওয়ের অ্যাসফল্ট ওভার-লে’র অনেক জায়গাই ক্ষয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট গর্তের। প্রতিদিন ক্ষয়ে যাওয়া রানওয়েতেই ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করছে দেশি বিদেশি এয়ারক্রাফট। ১৭ বছর আগে নির্মিত রানওয়ের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও এ বিমানবন্দরটির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। বোয়িং-৭৭৭ কিংবা আরো ভারী এয়ারক্রাফটের ওঠা-নামা সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিমানবন্দরের ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৬০ বর্গ মিটার রানওয়ে ও টেক্সিওয়ের শক্তিশালীকরণ জরুরি। তা না হলে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বিমানবন্দরটিকে আরো বিশ্বমানের করা জরুরি। সব মিলিয়ে রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিশালীকরণসহ অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির জন্য ৫৬৮ কোটি ৫৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকার প্রয়োজন বলে সূত্রে জানা গেছে। তাছাড়া বিমানবন্দরটির সাইড স্ট্রিপ গ্রেডিং এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থারও উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন এয়ার ফিল্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন। তবে আশার বিষয় যে, জরুরি ভিত্তিতে রানওয়ে নির্মাণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদ্যমান ‘রানওয়ে ও টেক্সিওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist