মৌলভীবাজারে ঝর্নার পাহাড় পাথারিয়া

অবিরাম শাঁ-শাঁ শব্দ!

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

ওমর ফারুক নাঈম, মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজারের রোমাঞ্চকর পাহাড় পাথারিয়া। প্রতিবেশী ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এ পাহাড়ের সবুজ অরণ্যের বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে কয়েকটি ঝর্ণা। স্থানীয়রা আদর করে নাম দিয়েছেন ঝেরঝেরি, কাখড়াছড়ি, ফুলঢালনি আর ইটাউরি ফুলবাগিচা। এ ঝর্ণাগুলো পাথারিয়া পাহাড়কে সাজিয়েছে অনন্য সৌন্দর্যে। সারাক্ষণই শোনা যায় সাঁ সাঁ শব্দ। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাথারিয়া পাহাড় মন কাড়ে ভ্রমণপিপাসুদের। স্থানীয়দের মধ্যে লোকশ্রুতি আছে, পাথারিয়া পাহাড়ের জন্ম লাখো বছর আগে। এর প্রাচীন নাম ‘আদম আইল’। অনেক বছর আগে ‘পাথরি’ নামক এক জনগোষ্ঠী বাস করত এ অঞ্চলে। সেখান থেকেই এসেছে ‘পাথারিয়া’। ২৫ মাইলজুড়ে সবুজ অরণ্যে ঘেরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এ ঝর্ণাগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল।

বড়লেখা সদর ইউনিয়নের ডিমাই বাজার থেকে পাথারিয়া পাহাড়ের নির্জন পল্লী ডিমাইপুঞ্জির পাশ দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি ছড়ার পথে হেঁটে গেলেই চোখে পড়বে কয়েকটি ছোট ঝর্ণা। ছয় কিলোমিটার পিচ্ছিল পাথুরে ছড়া দিয়ে হাঁটার পর ওপরে উঠলে দুটি টিলার ভেতরে দেখা যাবে ঝেরঝেরি ঝর্ণা। ঝেরঝেরির ঠিক ডান পাশে রয়েছে ইটাউরি ফুলবাগিচা ঝর্ণা। ফুলবাগিচায় যেতে হলে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ফুট উঁচু খাড়া দুটি পাহাড়ের পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিতে হবে। পাথারিয়া পাহাড়েরই অন্য প্রান্তে দেশের অন্যতম বৃহৎ জনপ্রিয় জলপ্রপাত মাধবকু-। প্রকৃতির এক অপরূপ লীলা নিকেতন মাধবকু-। প্রায় ২০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে জলরাশি পাথারিয়ার গা বেয়ে অবিরাম ধারায় সাঁ সাঁ শব্দে নিচে পড়ছে। অবিরাম পতনের ফলে নিচে সৃষ্টি হয়েছে কু-ের। আর কু-ের প্রবাহমান স্রোতধারা শান্তির বারিধারার মতো মাধবছড়া দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কথিত আছে যে, শ্রীহট্টের রাজা গঙ্গাধ্বজ ওরফে গোবর্ধন পাথারিয়া পাহাড়ে একটি বিশ্রামাগার নির্মাণ শুরু করলে সেখানে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় মাটির নিচে একজন সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। তখন তিনি ওই সন্ন্যাসীর পদবন্দনা করলে সন্ন্যাসী তাকে নানা উপদেশসহ মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশ তিথিতে তাকে এ কু-ে বিসর্জন দিতে নির্দেশ দেন। সন্ন্যাসী বিসর্জিত হওয়া মাত্র তিনবার ‘মাধব’ নামে দৈববাণী হয়। এ থেকেই মাধবকু- নামের উৎপত্তি।

আবার কারো কারো মতে, মহাদেব বা শিবের পূর্বনাম মাধব এবং এর নামানুসারে তার আবির্ভাব স্থানের নাম মাধবকুপ। এ কুপের পাশেই স্থাপন করা হয়েছে শিবমন্দির। যে পাহাড়টির গা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে এ পাথারিয়া পাহাড়টি সম্পূর্ণ পাথরের। মাধবকু- থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে পরিকু- নামের আরো একটি জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকেও অনবরত পানি পড়ছে।

ঝেরঝেরি ও ইটাউরি ফুলবাগিচার মতো পাথারিয়া পাহাড়ের এই অংশ থেকে চোখে পড়বে ত্রিপল ঝর্ণা, যামিনীকু-, যমজ ঝর্ণা, রজনীকু-, পুছুম ঝর্ণা, বন্দরডুবা, পাইথুং ও রামাকু- নামে কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন ঝর্ণা। এগুলোর বেশির ভাগই মৌসুমি ঝর্ণা। বর্ষাকালে ঝর্ণাগুলো যৌবনদীপ্ত থাকে। শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। এ ছাড়াও পাথারিয়া পাহাড়ের ফুলছড়ি নামক স্থানে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নান্দনিক সেতু।

স্বচ্ছ জলের ছড়ার কলকলিয়ে বয়ে চলা ঠা-া জল। জঙ্গলপথ, পাহাড়ি ঢাল, ঝোপঝাড় আর হরেক গাছগাছালি। চারদিকে চোখে পড়বে সবুজ আর সবুজ। টিলার ভেতরের পথ খুব সরু, পিচ্ছিল পাথরের আঁকাবাঁকা পথ। পাথারিয়া পাহাড়ে অনেক উঁচু টিলা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য দুরবিন টিলা, গগন টিলা, রাজবাড়ি টিলা। সবচেয়ে উঁচু দুরবিন টিলা। এটাতে উঠে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাবে দূরে ভারতের লোকালয়। টিলার ভাঁজে ভাঁজে হয় খাসিয়াদের পানপুঞ্জি ও জুম চাষ।

 

 

"