reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৯ ঘণ্টা আগে

ইসির আভাস

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আইন ও বিধিমালায় আসছে সংস্কার  

দেশের তৃণমূল পর্যায়ের শাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বিতর্কহীন করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

অক্টোবর মাসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন তাদের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় বড় ধরনের সংস্কার আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান আইনি অসঙ্গতি দূর করে একটি অভিন্ন ও কঠোর আইনি কাঠামো দাঁড় করাতেই ইসির এই মহাপরিকল্পনা।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত আইনের খসড়া সংশোধনী প্রায় প্রস্তুত। এটি চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য দ্রুতই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত এবং জাতীয় সংসদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে এই ঐতিহাসিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি: এই সংস্কার প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত দিক হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র সংজ্ঞায় নতুনত্ব আনা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত করা যায়। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে এই সুযোগ বা সংজ্ঞা সব আইনে সমানভাবে স্পষ্ট নয়।

নির্বাচন কমিশন এবার সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের সহিংসতা রোধ, কেন্দ্র দখল এবং নির্বাচনী অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব স্তরের স্থানীয় নির্বাচনে একই ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

দাগী অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের জন্য বন্ধ হচ্ছে দুয়ার: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুস্থ ধারা বজায় রাখতে প্রার্থীদের যোগ্যতার মাপকাঠিতে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করছে ইসি। বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিটভুক্ত কোনো আসামি স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ইতিপূর্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংশোধনের মাধ্যমে এই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছিল। এবার তৃণমূলের নেতৃত্বকেও এই কলঙ্কমুক্ত রাখার উদ্দেশে নিয়মটি সব স্থানীয় সরকার আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহী বা গুরুতর মামলার ফেরারি (পলাতক) আসামিদেরও নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করার কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে।

ঋণখেলাপি ও জামিনদারদের ওপর কঠোর নজরদারি: আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে ইসি এবার আরও এক ধাপ এগিয়েছে। শুধু সরাসরি ঋণখেলাপিরাই নয়, বরং ঋণখেলাপি কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশীদার পরিচালক এবং ঋণখেলাপিদের গ্যারান্টার বা জামিনদারদেরও আসন্ন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর ফলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে বা অন্য কারও ঋণের জামিনদার হয়ে খেলাপির দায় নিয়ে কেউ জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পাবেন না। এতে করে সৎ এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছ ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন, যা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নত করবে।

হলফনামায় অসত্য তথ্যে প্রার্থিতা বাতিলের খাঁড়া: বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাঙ্গণে অন্যতম একটি বড় সংস্কার ছিল হলফনামার তথ্যের সত্যতা যাচাই। প্রার্থীরা অনেক সময় তাদের সম্পদ, মামলা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিতেন, যা পরে প্রমাণিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতো।

নির্বাচন কমিশন এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে সরাসরি প্রার্থিতা বাতিলের বিধান যুক্ত করতে চায়। প্রস্তাবিত আইন পাস হলে, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপনের বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল বা বিজয়ী হলে তার প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।

এর পাশাপাশি প্রার্থীদের ওপর যারা সরাসরি নির্ভরশীল (যেমন: সন্তান বা স্ত্রী), তাদের সম্পদের তথ্য বা ডিপেন্ডেন্ট সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রেও সব আইনে একটি অভিন্ন নিয়ম বা ইউনিফর্মিটি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব ও লাভজনক পদের জটিলতা নিরসন: স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের আইনে দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং সরকারের কোনো লাভজনক পদে (Office of Profit) বহাল থেকে নির্বাচন করার যোগ্যতার বিষয়ে কিছু আইনি ধোঁয়াশা ছিল। কোনো কোনো আইনে এটি স্পষ্ট থাকলেও অন্যটিতে ছিল শিথিলতা।

ইসি কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম এই বিষয়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং লাভজনক পদে থাকার কারণে অযোগ্যতার বিষয়টি সব স্থানীয় আইনের ক্ষেত্রে সমানভাবে স্পষ্ট ও কার্যকর করা হবে। সরকারি বা আধা-সরকারি কোনো লাভজনক পদে থেকে কেউ প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন করতে পারবেন না এবং বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।

অভিন্ন নির্বাচনী সময়সীমা ও পর্যবেক্ষক নীতি: বর্তমানে বাংলাদেশে একেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নির্বাচন আয়োজনের সময়সীমা একেক রকম। যেমন, সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে এক নিয়ম, ইউনিয়ন বা উপজেলার ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম। এই ভিন্নতার কারণে নির্বাচন কমিশনকে বছরজুড়ে দফায় দফায় নির্বাচনী সূচি তৈরি করতে হয়, যা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ ব্যয়বহুল। এই জটিলতা এড়াতে নির্বাচন কমিশন সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সীমা একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে বা কাছাকাছি সময়ে দেশের বড় অংশের স্থানীয় নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

একই সাথে, সব স্তরের নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সমতা আনা হচ্ছে। কোনো কোনো নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠানো সহজ হলেও অন্যগুলোতে জটিলতা থাকত। এখন থেকে পর্যবেক্ষকদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং আচরণবিধি সব নির্বাচনের জন্য একই হবে।

নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের স্পষ্টীকরণ: আইনে ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ’ কথাটি উল্লেখ থাকলেও অনেক সময় কোন অপরাধগুলো এর আওতায় পড়বে, তা নিয়ে আদালতে বা আইনি ব্যাখ্যায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতো। নতুন খসড়ায় নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের সংজ্ঞা ও পরিধিকে আরও সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট করা হচ্ছে, যাতে চরিত্রগতভাবে বিতর্কিত বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা আইনি ফাঁকফোকর গলে নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারেন।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও সংস্কারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা মূলত আইনগুলোর মধ্যে একটি ইউনিফর্মটি বা সমতা আনার চেষ্টা করছি। কোনো আইনে কোনো বাহিনী আছে, কোনোটিতে নেই—এমনটা হওয়া উচিত নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ডেফিনেশনে আমরা সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করব। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিট হলে জাতীয় সংসদের মতো এখানেও তারা অযোগ্য হবেন। হলফনামা ও নির্ভরশীলদের তথ্যের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বজায় থাকবে। আমাদের এই পর্যবেক্ষণ ও খসড়া সরকারের দৃষ্টিগোচরে নেওয়া হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী আইন পাস হলে তা কার্যকর হবে।

রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। স্থানীয় সরকার হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে তৃণমূলের স্তম্ভ। সেখানে যদি ঋণখেলাপি, মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি বা অসত্য তথ্য প্রদানকারীরা স্থান পেয়ে যান, তবে পুরো শাসনব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে নির্বাচন কমিশনের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।

আসন্ন অক্টোবর মাসের নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংস্কারগুলো যদি সত্যি কার্যকর করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাসে একটি নতুন এবং স্বচ্ছ অধ্যায়ের সূচনা করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়