অনিরুদ্ধ বিশ্বাস, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

  ২৪ নভেম্বর, ২০২২

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস 

শিক্ষা কার্যক্রমের ৩২ বছর 

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের গল্লামারীতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস- প্রতিদিনের সংবাদ  

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস শুক্রবার (২৫ নভেম্বর)। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের বত্রিশ বছর পূর্ণ হল। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আপামর মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা স্বপ্ন ও ত্যাগ।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, ১৯৮৭ সালের ৪ জানুয়ারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালের ৯ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করা হয়। ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯০’ পাস হয়, যা গেজেট আকারে প্রকাশ হয় ওই বছর ৩১ জুলাই। এর পর ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে ৪টি ডিসিপ্লিনে ৮০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়। ১৯৯১ সালের ৩০ আগস্ট প্রথম ওরিয়েন্টেশন এবং ৩১ আগস্ট ক্লাস শুরুর মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয়। একই বছরের ২৫ নভেম্বর শিক্ষা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রতিবছর দিনটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এখানে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা, চারুকলা ও অন্যান্য বিষয়ও পড়ানো হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল বা অনুষদের সংখ্যা ৮ এবং ডিসিপ্লিন বা বিভাগের সংখ্যা ২৯। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। যার মধ্যে ২১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক আছেন পাঁচ শতাধিক, যার এক তৃতীয়াংশই পিএইচডি ধারী। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১২ যা বিশ্বমানের। ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ৫৪:৪৬ যা দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কর্মকর্তা তিন শতাধিক এবং কর্মচারির সংখ্যা প্রায় সাড়ে চারশ। এ পর্যন্ত ৬টি সমাবর্তনে প্রায় ১৫ হাজার গ্র্যাজুয়েটকে আনুষ্ঠানিক অভিজ্ঞানপত্র প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ৩২ বছরে কোনো ছাত্র সংঘর্ষ, হানাহানি বা রক্তপাত হয়নি। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজট, সন্ত্রাস ও রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শ্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে লার্ন, লিড অ্যান্ড লিভ।

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের একাত্তরের বধ্যভূমি গল্লামারীতে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান। ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত স্নিগ্ধ ও পরিচ্ছন্ন। প্রত্যেকটি ভবনের নামকরণ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শহিদ তথা বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারেই চোখে পড়বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুউচ্চ ম্যুরাল, যার গায়ে উৎকীর্ণ আছে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এছাড়া রয়েছে শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ প্রশাসন ভবন, ড. সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবন, আচার্য জগদীশচন্দ্র একাডেমিক ভবন, কবি জীবনানন্দ দাশ একাডেমিক ভবন, বঙ্গমাতা হল।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি স্থপত্যশৈলী চমৎকার। এর ছাদ দৃষ্টিনন্দন টেনসাইল মেমব্রেনে তৈরি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বুয়েটের পরই ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স ক্রেডিট পদ্ধতি চালু হয়। এখানে স্নাতক পর্যায়ে নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিন, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিন এবং ঢাকার বাইরে স্থাপত্য ডিসিপ্লিন ও কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন প্রথম চালু হয়। দেশের মধ্যে ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় হিসেবে চালু হয়। সুন্দরবন ও উপকূল নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থাপিত হয়েছে ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস এন্ড কোস্টাল ইকোসিস্টেম (আইআইএসএসসিই)। এখানে স্থাপিত হয়েছে দেশের প্রথম সয়েল আর্কাইভ। এখানে সংগৃহীত আছে দেশের ৫টি জোনের এক হাজার আটশত আটান্নটি প্লটের ৫ হাজারের বেশি মাটির নমুনা। শিক্ষার্থীদের ৩২টি অরাজনৈতিক সংগঠন আছে। তারাই সারাবছর উৎসবমুখর রাখে ক্যাম্পাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন ও গ্রহণে আগামী ১০ বছরের জন্য জনবলের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়। সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই অর্গানোগ্রাম (২০২১-২২ থেকে ২০৩১-৩২) ইউজিসির চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নয়ন নীতিমালা সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পরিসীমায় নিয়ে যাওয়া এবং বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেণায় যুক্ত করতে বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে করা হয়েছে অনেকগুলো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর বা এমওইউ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে। গত বছর ৬২টি গবেষণা প্রকল্পে দুই কোটি টাকার অনুদান প্রদান করা হয়। চলতি বছর এই বরাদ্দ ২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা অনুদান প্রবর্তন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭৭ জন গবেষককে ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা আনুষ্ঠানিভাবে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এ বছর ৭২ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় গবেষণারের জন্য এ বছর ৬ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সংস্থান করা হয়েছে। এখানে একটি সেন্ট্রাল কম্পিউটিং ল্যাব স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়া আইসিটি সেলের মাধ্যমে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটালাইজেশন করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারকেও নেওয়া হচ্ছে অটোমেশনের আওতায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পাশাপাশি উদ্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় এ অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ইনোভেশন হাব তৈরির কাজ চলছে।

এখানে বর্তমান সরকারের অনুমোদিত চারশ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১০ তলা জয়বাংলা একাডেমিক ভবন, সুলতানা কামাল জিমনেশিয়াম, টিএসসিসহ ২৪টি অবকাঠামোর কাজ।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়,খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close