লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ

  ২৩ নভেম্বর, ২০২১

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিপর্যয় রোধে করণীয়

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)-কে বিশ্বের জন্য মহাবিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবাইকে বিপর্যয় রোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বছরে প্রায় সাত লাখ বা তারও বেশি লোক পরিস্থিতির জন্য মৃত্যুবরণ করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল থেকে প্রতি বছরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সজনিত সমস্যায় মারা যাবে এক কোটি ভুক্তভোগী। তাই প্রতিরোধ যুদ্ধে অন্যান্য বছরের মতো বছর ১৮-২৪ নভেম্বর পর্যন্ত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এর কার্যকরী প্রতিরোধে বছরের মূল প্রতিপাদ্য ‘Spread awareness, Stop Resistance’

ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে ক্ষুদ্র অণুজীব ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল প্রায় তিন থেকে চার বিলিয়ন বছর আগে। তবে ১৬৭৬ সালে বিজ্ঞানী লিওয়েন হুক অণুজীবের অস্তিত্ব খুঁজে পান। ১৮২৮ সালে একে ব্যাকটেরিয়াম নামে আখ্যা দেন বিজ্ঞানী এরেনবার্গ, বিশ্বখ্যাত লুইপাস্তুর ১৮৭০ সালে এবং ১৯০৫ সালে রবার্ট কচ দেও প্রকৃতি নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন।

অণুজীবগুলো খাদ্য উৎপাদন, পানি শোধন, জৈব জ্বালানি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়, তেমনি মানবদেহে রোগব্যাধি সৃষ্টিতেও পটু। এসব রোগব্যাধি প্রতিরোধ চিকিৎসায় বিভিন্ন আঙ্গিকে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই। তবে ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্রেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কার অ্যান্টিবায়োটিক জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ব্যবহার যেমন রোগব্যাধি নিরাময়ে অভূতপূর্ব ফল লাভে সক্ষম হয়; পাশাপাশি এর অতিরিক্ত অপব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর বিরুদ্ধে অণুজীবগুলোর প্রতিরোধ গড়ে তুলে এর কার্যকারিতা বিনষ্ট করার প্রক্রিয়া অবস্থাকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। ২০১৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে এএমআরকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৮ লাখ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জনিত রোগী শনাক্ত হয়, মারা যায় ৩৫ হাজার। ২০১৩ সালে ৩৯টি দেশের এক জরিপে দেখা গেছে, নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে দেড় লাখ। একই কারণে অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ড্রাগে মৃত্যু হয়েছে ১২ হাজার শিশুর। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৯০ মিলিয়ন ডলার। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও ব্যবহৃত ৩০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই ছিল অপ্রয়োজনীয়।

২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন ছিল না। হাজার ৫০০ কোভিড-১৯ রোগীর মধ্যে মাত্র শতাংশে দেহে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ছিল অথচ সব ক্ষেত্রে জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছিল। বৈশ্বিক কোভিড-১৯ অতিমারি বিভিন্নভাবে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার, পিপিইগুলোর পুনর্ব্যবহার, আইসোলেশন সুবিধার অপর্যাপ্ততা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঘটতি, টেলিমেডিসিনে নির্ভরতা, প্যাথলজি ল্যাবরেটরিগুলোর ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ ইত্যাদি।

মূলত চারটি প্রক্রিয়ায় জীবাণুগুলো রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভ করে। প্রাকৃতিকভাবে ক্রমাগত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় এসব অণুজীব পরবর্তী সময়ে বংশবৃদ্ধি করে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্তদের দল ভারী করতে সক্ষম হয়। প্রক্রিয়ায় অনেক জীবাণু জিনগত পরিবর্তন করে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও এএমআরের অন্যতম কারণ।

ভারতের পাঞ্জাবের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণের প্রায় ৭৩ শতাংশ ছোটখাটো অসুখ-বিসুখে আগের কিছু অভিজ্ঞতা, আত্মীয়স্বজনের পরামর্শ কিংবা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকে। চিকিৎসকরা কর্তৃক অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে কারণেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হয়ে থাকে।

সিডিসির মতে, প্রায় অর্ধেক রোগীর ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বাচন, ডোজ মাত্রা সঠিক থাকে না। ফ্রান্সে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোর দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রকৃতিতে অবস্থান করা জীবাণুগুলোকে রেজিস্ট্যান্স লাভে ভূমিকা পালন করে। চতুর্থ, প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ফসলে কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ, রোগ নির্ণয় না করে বা একই রোগে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ইত্যাদি (এএমআর)-এর নানাবিধ কারণ।

প্রাকৃতিক ভাবে জীবাণুসমূহ প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভের পর নিজস্ব গতিতে বংশবিস্তার করে এদের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা লোপ পায় এবং এসব জীবাণু অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ছাড়া জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যান্য প্রাণী উদ্ভিদেও এদের বিস্তার ঘটে। ফলে মানুষসহ পরিবেশের অন্য প্রাণীদেরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত কিংবা অপব্যবহারের ফলেও জীবাণুগুলো ক্রমাগত প্রতিরোধ বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এবং এক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে পড়ে। অনেক সময় আমরা রোগের উপসর্গে উন্নতি হওয়ামাত্রই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দেই, ফলে জীবাণুগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংসের পরিবর্তে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে একই অ্যান্টিবায়োটিক এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশে এএমআর পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০-৭০ ভাগ প্রথম জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শিশু বৃদ্ধদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত অপপ্রয়োগ লক্ষণীয়। সেফট্রিয়েক্সন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন কিংবা এজিথ্রোমাইসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর ব্যবহার যত্রতত্র এবং অহরহ। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না; এক রোগীর জন্য একই সময় একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং সাধারন জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে প্রায় ১০০ ভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ হয়ে থাকে। ৫০ শতাংশ রোগীই অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ সম্পূর্ণ শেষ করে না; ৩০-৪০ শতাংশ রোগী নিজস্ব উদ্যোগেই বিভিন্ন কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন। ছাড়া অধিকাংশ পোলট্রি গবাদিপশু খামারে প্রচুর পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়ে থাকে, ফলে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্ত জীবাণুগুলো খাবারের সঙ্গে এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্বকে ভয়াবহ দিকে ধাবিত করছে। বিষয়ে সচেতন না হলে এবং নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন না হলে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমাদের অবশ্যই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে উদ্যোগী হতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সব স্বাস্থ্যবিধি যথা- হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পানীয় গ্রহণ, রোগ প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ ইত্যাদি মেনে চলতে হবে। চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত সবাইকে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কিংবা রোগীর প্রয়োজনীয়তা নিরিখেই অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার, সংক্রমণ প্রতিরোধ এএমআরের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণদের সচেতন করে তুলতে হবে। ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা সংস্থাগুলোকে অ্যান্টিবায়োটিক লেখা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো বন্ধ করতে হবে। নতুন জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন এবং উৎপাদনে বিনিয়োগ গবেষণা কাজে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। হাসপাতালগুলোকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, রেজিস্ট্যান্সের অপকারিতা বিষয়ে সবাইকে সচেতন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষি, পোলট্রি মৎস্য উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নীতিমালা মেনে চলতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে গাইডলাইন সংবলিত জাতীয় নীতিমালা রয়েছে। সম্প্রতি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিম-লে পাঁচ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে। এরমধ্যে বৈশ্বিক আঞ্চলিক ভিত্তিতে এএমআর প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান; নতুন জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনে প্রযুক্তির শেয়ার এবং দরিদ্র দেশগুলোতে সহজলভ্য করা; ওষুধ উৎপাদন, ল্যাবরেটরি কার্যক্রমে উন্নয়ন জরিপ কর্মকাণ্ডে নজরদারী জোরদারকরণ এবং সর্বোপরি এএমআর প্রতিরোধে অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে সব দেশ অঞ্চলে সচেতনতা গড়ে তোলা উল্লেখ্য।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বিপর্যয় প্রকট আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

সহকারী পরিচালক, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ,রেজিস্ট্যান্স বিপর্যয়,অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল,অ্যান্টিবায়োটিক
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close