১৩ মাস ধরে জেলে

ইয়াবা ও অস্ত্রের সাজানো মামলায় মাদরাসাছাত্র মোস্তফা

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২০, ১৩:৫৬ | আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ১৪:১৮

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার

২৭ মে ২০১৯। এর তিনমাস আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাড়ি ফেরেন টেকনাফ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম সাতঘরিয়াপাড়ার জকরিয়া প্রকাশ জকু। প্রবাসী থেকে টাকা আদায়ের জন্য তার মাদরাসা পড়ুয়া শিশু সন্তানকে গত বছরে ২৭ মে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ১০ লাখ টাকা। দাবিকৃত টাকা না দিলে ইয়াবা ও ৫টি অস্ত্র দিয়ে আদালতে চালান দেওয়া হুমকি দেয়।

তিন দিন পর পুলিশ তাকে নিয়ে হোয়াইক্যংয়ের সাতঘরিয়া পাড়ায় তার বাড়িতে ইয়াবা ও অস্ত্র খুঁজতে ফিরে আসে, কিছু পায় না। ছেলেকে মুক্ত করতে প্রবাস ফেরত বাবা কিছু টাকাও দেন পুলিশকে। কিন্তু এতেও মন গলাতে পারেনি পুলিশের।

চতুর্থ দিন (৩১ মে ২০১৯) এসে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ বলে, পাশের বাড়ির মফিজ আলমের বিছানার নিচ থেকে ইয়াবা আর অস্ত্র বের করে দিয়েছে মো. মোস্তফা।

টাকা দেওয়ার পরেও মোস্তফা (১৬)-কে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেয় পুলিশ। পরে ২০ হাজার পিস ইয়াবা, ৫টি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও ৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার দেখিয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে আদালতে সোপর্দ করে ৮ শ্রেণিতে পড়ুয়া মাদরাসাছাত্র মোস্তফাকে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়।

গত সাড়ে ১৩ মাস ধরে জেলে রয়েছে হোয়াইক্যং মহেশখালীয়াপাড়া বাহারুল উলুম দাখিল মাদরাসার ছাত্র মোস্তফা। এতদিনেও জেল থেকে জামিনে মুক্ত করতে পারেনি পরিবার।

তার মা ভেলুয়ারা বেগম বলেন, ২৭ মে রাতে হঠাৎ এসে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় সাবেক ওসি প্রদীপ দাশের নেতৃত্বে এসআই বোরহান উদ্দিন ভুইয়া, এসআই সাব্বির আহমেদসহ একদল পুলিশ। এর তিন মাস আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে আসেন তার বাবা।

তিনি জানান, তার ছেলেকে মুক্তি দিতে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ছেলের বাবা প্রবাসী হলেও এত টাকা পুলিশকে দিতে ব্যর্থ হন। পরে তার ছেলে মোস্তফাকে ইয়াবা ও বন্দুক-গুলি দিয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে।

মামলা দুটির বাদী এসআই (নিরস্ত্র) বোরহান উদ্দিন ভুইয়া। অস্ত্র আইনে দায়ের কৃত টেকনাফ থানার মামলা নং ৪, জিআর মামলা নং ৪৫১, মাদক আইনে দায়ের কৃত টেকনাফ থানার মামলা নং ৫, জিআর মামলা নং ৪৫২, মামলা দুটির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সাব্বির আহমেদ। মামলা দুটি রেকর্ড করেন টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ নিজেই।

সাতঘড়িয়াপাড়ার বাসিন্দারা বলেছেন, হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্য আগে পাড়ায় এসে তাদের সরিয়ে দিয়ে প্রতিবেশী মফিজ আলমের বাড়ি ঘিরে ফেলেছিলেন। মোস্তফাকে নিয়ে থানার পুলিশ আসে পরে। কিছুক্ষণ পর মোস্তফার হাতে ইয়াবা আর অস্ত্র দিয়ে পুলিশ সাংবাদিকদের ডাকে, ছবি তোলে।

মোস্তফার পরিবার জানায়, ছেলে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এক লাখ টাকা নেন। মাদরাসার প্রত্যয়নপত্র, জন্মনিবন্ধনে তার বয়স ১৬ বছর উল্লেখ থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এই কিশোরকে ২২ বছর উল্লেখ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

তার মা ও বাবা প্রতীক্ষায় আছে তাদের ছেলে কবে জেল থেকে ফিরবে। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ মাদরাসাছাত্রের অবিলম্বে মুক্তির দাবি করে সাবেক ওসি প্রদীপসহ এ ধরনের নাটক সাজিয়ে একজন কোমলমতি শিশুর ভবিষ্যত অন্ধকারে ঠেলে দেওয়াদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

পিডিএসও/হেলাল