সোনালি অতীত

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু

ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন উল্লেখ করার মতো শক্তি। আমাদের অতীত ক্রীড়াঙ্গনও গৌরবের। এখানে অনেক প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ এসেছেন যাঁরা নিরলস শ্রম, অধ্যবসায় এবং মেধা দিয়ে নিজেরা হয়েছেন আলোকিত, বিশ্বের দরবারে দেশকে করেছেন সম্মানিত। নতুন প্রজন্মের অনেকেরই হয়তো এটা জানা নেই। আবার বিস্মৃত হয়েছেন কেউবা। তাদের নিয়েই দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন ‘সোনালি অতীত’। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের গ্রেটদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্র্রয়াস আমাদের। আজকের তারকা সাবেক ফুটবলার জাকারিয়া পিন্টু

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:০০

খেলা প্রতিবেদক

মুক্তিযুদ্ধে বাংলার আপামর সাধারণ মানুষ কেবল অস্ত্র হাতেই নয়, তারা লড়েছে গান, কবিতা ও ফুটবল পায়ে নিয়েও। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ফুটবলের জাদু দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরির কাজ করেছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। আর সেই দলের অকুতোভয় কা-ারির নাম জাকারিয়া পিন্টু। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জাকারিয়া পিন্টু ও তার নেতৃত্বাধীন ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের’ নাম অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে কেবল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে নন, একজন অসাধারণ ফুটবলার এবং অধিনায়ক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।

মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টুর জন্ম নওগাঁয় ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি। ১০ বছর বয়সে নওগাঁ শহরের কৃষ্ণদেব হাই স্কুলের খেলার মাঠে তার ফুটবলে হাতেখড়ি হয়। ফুটবলের টানে তিনি চলে যান বরিশাল। ১৯৫৪ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন দুর্দান্ত ফুটবলার হিসেবে সবার নজরে আসেন তিনি। মূলত রক্ষণভাগে খেলার পাশাপাশি নেতৃত্ব গুণের কারণে সমগ্র ফুটবল ক্যারিয়ারে তাকে অধিকাংশ সময় অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬০ সালে ভর্তি হন বরিশালের বিএম কলেজে। তার কলেজ শেরেবাংলা শিল্ডে চ্যাম্পিয়ন এবং আন্তঃকলেজ ফুটবলে রানার্সআপ হন। ¯œাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৬৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৫৭ সালে কলেজে পড়ার সময় ইস্টএন্ডের দ্বিতীয় বিভাগে খেলার আমন্ত্রণ পান। ট্রায়ালে তার ক্রীড়াশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে তাকে সরাসরি প্রথম বিভাগে খেলানো হয়। ১৯৫৭ ও ৫৮ সালে ইস্টএন্ডে খেলার পর ১৯৫৯ সালে যোগ দেন তৎকালীন জনপ্রিয় দল ঢাকা ওয়ান্ডারার্সে। ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার এ ফুটবলার ওয়ান্ডারার্সের হয়ে হাফ ব্যাকে খেলে সবার নজর কেড়ে নেন। দুর্দান্ত ফুটবল দক্ষতার কারণে তার নাম হয় ‘কালো পাহাড়’। ১৯৬০ সালে ওয়ান্ডারার্স লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে যোগ দেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। এর পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর মোহামেডানে খেলে ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি হয়েছিলেন দেশের সেরা স্টপার। ক্লাবে যোগ দেওয়ার প্রথম বছরই মোহামেডান লিগ, স্বাধীনতা দিবস টুর্নামেন্ট ও বরিশালের শেরেবাংলা শিল্ডে চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৫ সালে যখন খেলা ছেড়ে দেন, সেবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় মোহামেডান। এছাড়া খেলোয়াড় হিসেবে তিনি লিগ শিরোপার স্বাদ পান ১৯৬৩, ৬৫ ও ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৮ সাল থেকে ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত রেকর্ড আট বছর তিনি ছিলেন মোহামেডানের অধিনায়ক। ১৯৬৮ সালে তার নেতৃত্বে আগাখান গোল্ড কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ওই বছরই তিনি জাতীয় দলে স্থান করে নেন।

তার নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের মাটিতে ১৬টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ১২টিতে জয় ও দুটিতে পরাজিত হয়। ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মুজিবনগর একাদশের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৯তম মারদেকা ফুটবলে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক এবং একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ইতিহাস হয়ে আছেন।

"