মাহফুজুর রহমান, মুরাদনগর (কুমিল্লা)
মুরাদনগরে কৃষকদের আর্তনাদ
ফসলি জমি গিলছে অবৈধ ড্রেজার, ঝুঁকিতে তিন ফসলি জমি

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় অবৈধ ড্রেজার দিয়ে ফসলি জমির মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র কৃষিজমির মাটি তুলে বিক্রি করছে। ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সর্বশেষ বাঙ্গরা বাজার থানাধীন মকলিশপুর পশ্চিম বিলে ড্রেজার বসিয়ে তিন ফসলি জমির মাটি উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষমতার দাপটে প্রকাশ্যেই চলছে মাটি খনন
সরেজমিনে মকলিশপুর পশ্চিম বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত ফুট পাইপ বসিয়ে ফসলি জমি থেকে দেদার মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এই অবৈধ ড্রেজার বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপির দুই নেতা—বাঙ্গরা সদর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাসুক ইসলাম পাখি এবং ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলম চৌধুরী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা প্রকাশ্যেই এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী কৃষক জানান, তিন ফসলি জমি থেকে গভীর করে মাটি কাটার ফলে পাশের আবাদি জমিগুলো ধসে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ওই পুরো এলাকায় কৃষি উৎপাদন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকেরা আরও অভিযোগ করেন, ড্রেজার বন্ধের বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করতে গেলে রাজনৈতিক ভয়ভীতি ও হুমকি ধামকি দেওয়া হয়।
'আমরা বেশি মাটি কাটব না'
অবৈধ ড্রেজার পরিচালনার বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে অভিযুক্ত আলম চৌধুরী বলেন, “হ্যাঁ, ড্রেজারটি আমার। তবে আমরা বেশি মাটি কাটব না, অল্প কিছু মাটি কেটেই কাজ বন্ধ করে দেব।”
সহযোগী মাসুক ইসলাম পাখি বলেন, “ড্রেজারটি মূলত আলম চৌধুরীর। তবে ব্যবসার সুবিধার্থে আমিও তার সঙ্গে এই কাজে যুক্ত আছি।”
এদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের এমন কাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাঙ্গরা সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি দুলাল। তিনি বলেন, অবৈধ ড্রেজার বন্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের থামানো যাচ্ছে না। আমি আগেও তাঁদের ড্রেজার চালাতে নিষেধ করেছি, কিন্তু তাঁরা কারও কথা না শুনে নিজেদের মতোই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে একই চিত্র ও প্রশাসনের হুঁশিয়ারি
স্থানীয়দের দাবি, শুধু মকলিশপুর পশ্চিম বিলই নয়, বাঙ্গরা বাজার থানার দৌলতপুর, সিমানাপাড়া, যোগেরখিল, কালারাইয়াসহ অধিকাংশ ইউনিয়নেই দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। এতে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ডোবায় পরিণত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, কৃষিজমি রক্ষা এবং অবৈধ ড্রেজার বন্ধে প্রশাসনের অবস্থান অনমনীয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষিজমি রক্ষায় কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সচেতন মহলের অভিমত, গ্রামীণ অর্থনীতি ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখে কৃষিজমি। মুরাদনগরে রাজনৈতিক পরিচয়ে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে তিন ফসলি জমি ধ্বংস করা হচ্ছে, তা কেবল পরিবেশগত অপরাধই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এক ধরনের আগ্রাসন। মৌখিক হুঁশিয়ারি বা 'অল্প মাটি কাটার' খোঁড়া যুক্তিতে কান না দিয়ে, প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে স্পটে গিয়ে ড্রেজারগুলো ধ্বংস করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা।
পিডিএস/এমএইউ








































