জসিম উদ্দিন নাগর, ডিমলা (নীলফামারী)
ডিমলায় সড়ক পুনর্নির্মাণে অনিয়ম, তদন্তে সত্যতা পেলেন ইউএনও

নীলফামারীর ডিমলায় প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পুনর্নির্মাণকাজে শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) যথাযথ তদারকি ছাড়াই নিম্নমানের খোয়া, রাবিশ ও ভাঙা ইট ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ করার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এ ছাড়া কার্যাদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির গুণগত মান ও তদারকি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রকল্প বিবরণ ও চুক্তির তথ্য
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় সমায়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের অধীনে ডিমলা উপজেলার ‘বাবুরহাট জিসি-ডালিয়া আরঅ্যান্ডএইচ রাস্তা ভায়া শুটিবাড়ি সড়ক’ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত মূল্য ২ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৫ টাকা হলেও ২ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৯ টাকা ২৫ পয়সা চুক্তিমূল্যে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় নীলফামারী সদরের মসজিদপাড়া এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিদ্দি ইঞ্জিনিয়ারিং মার্কস। কার্যাদেশ অনুযায়ী গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে কাজ শুরু হয়ে ১৮ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কাজ শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও সরজমিন চিত্র
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত কার্পেটিং তুলে তা-ই পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ওপর রাবিশ মিশ্রিত নিম্নমানের খোয়া দিয়ে বেজ প্রস্তুতের কাজ চলছে। এ ছাড়া সড়কের দুই পাশে রেজিংয়ের কাজে এক নম্বর ইটের পরিবর্তে ভাঙা ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. দেলোয়ার হোসেন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সবুর খানসহ অনেকেই অভিযোগ করেন, কাজ চলাকালে এলজিইডির কোনো কর্মকর্তাকে তদারকিতে দেখা যায়নি। এই সুযোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করছে। সচেতন মহলের দাবি, সিডিউল মোতাবেক মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখা উচিত। এ ছাড়া প্রকল্পের প্রাক্কলন ও সিডিউলের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তথ্য প্রদানে টালবাহানা করেন বলেও স্থানীয়রা অভিযোগ তোলেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিদ্দি ইঞ্জিনিয়ারিং মার্কস-এর প্রতিনিধির সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
এলজিইডির নীলফামারী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হাসান জানান,“মঙ্গলবার (৩০ জুন) জেলা কার্যালয় থেকে সহকারী প্রকৌশলী শিশির চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ঠিকাদারের বিল ও জামানত আটকে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে বিধিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান বলেন, “সড়কের কাজ চলমান রয়েছে এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মূল কার্পেটিংয়ের আগে ব্যবহৃত সামগ্রীর গুণগত মান যাচাই করে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান জানান, “ডিমলা-ডালিয়া জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়ার পর গত মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে আমি নিজে সড়কটি পরিদর্শন করেছি। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় স্পট থেকে নিম্নমানের সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”
সচেতন মহলের অভিমত, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা জনগণের ট্যাক্সের টাকা। আড়াই কোটি টাকার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে নিম্নমানের ইট-রাবিশ ব্যবহার এবং প্রকৌশল দপ্তরের তদারকিহীনতা দুঃখজনক। কেবল সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার মৌখিক নির্দেশেই প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হয় না; কার্যাদেশের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও কাজ শেষ না করায় এবং জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
পিডিএস/এমএইউ








































