আব্দুস শুকুর, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

  ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

অপার সৌন্দর্যের রানী শ্রীমঙ্গল

চায়ের রাজধানী খ্যাত পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল। প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া দৃষ্টিনন্দন শহর শ্রীমঙ্গল। প্রায় দেড় শতাধিক বছরের প্রাচীন চা শিল্পের ঐতিহ্যের গৌরব বহনকারী দীর্ঘকালের পথ পরিক্রমায় প্রাকৃতিক আশ্রয়ে গড়ে উঠা পাহাড় ও সমতল ভূমির ওপর ছোট এই শহরের অবস্থান।

অপরুপ নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের মধ্যে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, পাহাড়ি ঝর্ণা, পাহাড়, হাইল-হাওরের মত জলাভূমি এবং অতিথি পাখির বিচরণের অভয়ারণ্য বাইক্কাবিল, লেক এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি ও বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ এই উপজেলা।

উঁচু-নিচু পাহাড় ঘেরা বন-বনানী আর নীল আকাশের সাথে যেন সবুজ পাহাড়ের মিতালি। নিজ চোখে না দেখলে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই বিচিত্র রূপ আর সৌন্দর্য একনজর দেখার জন্য প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ছুটে আসেন প্রকৃতির রানী শ্রীমঙ্গলকে দেখতে।

প্রকৃতির সুরম্য নিকেতন শ্রীমঙ্গলে আপনি দেখতে পাবেন দৃষ্টিনন্দন চা-কন্যা ভাস্কর্য, মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১ বা স্মৃতিস্তম্ভ বধ্যভূমি ৭১, চা জাদুঘর, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, অথিথি পাখিদের অভারণ্য বাইক্কাবিল, সবুজে ঘেরা চা-বাগান, তার্কিস স্থাপত্য শিল্পের জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ, লেক, ডিনস্টন সিমেট্রি, লালটিলা শিব মন্দির, হাইল হাওর, লেবু-আনারস আর রাবার বাগান।

নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠি খাসিয়া পুঞ্জি-মণিপুরি-গারো সম্প্রদায়ের জীবনাচার, হরিনছড়া গল্ফ মাঠ, বিটিআরআই, বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ও ত্রিপুরা মহারাজার কাচারি বাড়ি সাড়ে পাঁচ শ’ বছরের পুরোনো নির্মাই শিববাড়ী মন্দিরসহ আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে এখানে। আর দেশের ৯০ শতাংশ চা বাগান ও চায়ের উৎপাদন হয় এ অঞ্চলে।

শ্রীমঙ্গলে এসে ভানুগাছ সড়ক ধরে কিছুদূর এগুলেই ফিনলের চা কোম্পানীর ভুরভুরিয়া চা-বাগানের সামনে নির্মিত বধ্যভূমি ৭১, যা মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা যুদ্ধের এখানকার অনেক চা শ্রমিক ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আত্মত্যাগের ইতিহাস।

সেখান থেকেই দু’পাশে সবুজ চা বাগানের মাঝ দিয়ে রাস্তা। সামনেই চোখে পড়বে পথের দু’পাশে উঁচু-নীচুঁ পাহাড়, লেবু ও আনারসের বাগান। আঁকাবাঁকা পথ ধরে আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখা মিলবে জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়ার। প্রবেশ মুখ থেকেই শোনা যাবে নাম না জানা নানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

স্থানীয়ভাবে এটাকে ফরেষ্ট মিউজিক বলা হয়। লাউয়াছড়ার প্রাচীনসব গাছ-গাছালি, গুল্ম লতা উদ্ভিদ এর দেখা মেলে। নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী বানর আর হনুমানের অবাধ বিচরণ রয়েছে এ বনে। এসব বন্য প্রাণীদের এ গাছ থেকে অন্য গাছে লাফালাফি, অদ্ভুদ ডাকাডাকি মুহুর্তেই নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। ভাগ্য সুপশ্রন্ন হলে ভোরের নির্জনতায় রাস্তাতেই দেখা মিলতে পারে হনুমান, বানর, বন মোরগ, সাপ, উড়ন্ত কাঠবিড়ালী, সজারু, হরিণ, মেছো বাঘ, উল্লুকসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর।

শীতের মৌসুমে মাছের অভায়রণ্য বাইক্কা বিলে ভীর করে হাজারো প্রজাতির পরিযায়ি ও অতিথি পাখি। বাইক্কাবিল পাখিদেরও অভয়ারণ্য। পাখিদের কাছ থেকে দেখার জন্য এখানে রয়েছে সুউচ্চ পরিদর্শন টাওয়ার। পাখি প্রেমীরা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে নানা প্রজাতির পাখিদের জীবনাচার দেখে মুগ্ধ হয়ে উঠেন। বাইক্কা বিল শুধু পাখি নয় হাজারো জলজ উদ্ভিদের ভান্ডার। 

শ্রীমঙ্গলে এলে ঘুড়ে আসতে পারেন ভাড়াউড়া চা-বাগানের লেক থেকে। চারিদিকে সারি সাড়ি উঁচু পাহাড়। সবুজ চা বাগান দিয়ে এসব পাহাড় সৃজন করা। এর মাঝখানে ভাড়াউড়া লেক আর উপরে সুনীল আকাশ। এ যেন আকাশের সাথে পাহাড়ের মিতালি। 

ভাড়াউড়া লেক এর পাশেই রয়েছে জাগছড়া গরমটিলা মাজার। এই টিলা থেকে থেকে দেখতে পারেন প্রকৃতির অপরুপ দৃশ্য।

শ্রীমঙ্গলে রয়েছে প্রায় ৯৩টিরও বেশী নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাস। খাসিয়া, মনিপুরী, সাঁওতাল, টিপরা ও গারো সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র জীবনাচার এবং বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও সংস্কৃতি দেখলে  খানিক সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির কোলে মিশে যেতে মন চাইবে।

প্রতি বছর চা বাগানগুলোতে ‘ফাগুয়া উৎসব’, টিপরাদের ‘বৈসু উৎসব’ ও গারোদের ‘ওয়ানগালা উৎসব’ মনিপুরীদের ’রাস পূর্ণিমা’ উৎযাপিত হয় খুব জাঁকজমকভাবে। তাদের এই আনন্দ উৎসবে মিশে যেতে পারেন আপনিও।

স্বর্গের দেবতা যেন এখানে এসে নিজ হাতে ছুঁয়ে গেছেন প্রকৃতিকে। যার চোখ ধাঁধাঁনো সৌন্দর্য যে কাউকে খুব সহজে প্রকৃতির প্রেমে পড়তে বাধ্য করবে।

পিডিএসও/এসএম শামীম

 

অপার সৌন্দর্য,শ্রীমঙ্গল
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close