জাফরিন সুলতানা
মুক্তমত
মুঠোফোনে বন্দি শৈশব পরিণতি ও উত্তরণের পথ

একবিংশ শতাব্দী প্রযুক্তির যুগ। তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে পৃথিবী আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন কিংবা জ্ঞান অর্জন সব ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই আশীর্বাদের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি। যে বয়সে শিশুদের মাঠে দৌড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের পর্দার সামনে সময় কাটাচ্ছে। ফলে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বিকাশ হুমকির মুখে পড়ছে।
শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অভিভাবকদের ব্যস্ততা। আধুনিক জীবনের কর্মব্যস্ততায় অনেক মা-বাবা সন্তানকে সময় দিতে পারেন না। ফলে সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে কিংবা কান্না থামাতে সহজ সমাধান হিসেবে তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে শিশুরা মোবাইলের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাও এর একটি কারণ। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় মোবাইল ব্যবহার শিশুর মোবাইল আসক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে অনলাইন গেম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে আকৃষ্ট রাখে। রঙিন গ্রাফিক্স, দ্রুত পরিবর্তিত দৃশ্য এবং বিভিন্ন পুরস্কারভিত্তিক গেম শিশুদের মস্তিষ্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ফলে তারা বারবার মোবাইল ব্যবহার করতে চায়। বন্ধুদের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন সমবয়সীদের অধিকাংশই মোবাইল ব্যবহার করে, তখন অন্য শিশুরাও সেটির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
মোবাইল আসক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের সমস্যা, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা এবং চোখে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার কারণে স্থূলতা, দুর্বল শারীরিক গঠন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক শিশু রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করে, যার ফলে তাদের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শিশুর বৃদ্ধি, মনোযোগ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও মোবাইল আসক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে শিশুদের মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তারা পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না এবং সহজেই একঘেয়েমি অনুভব করে। বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিবর্তে তারা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, রাগ এবং আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়। মোবাইল কেড়ে নিলে শিশুদের অস্থিরতা বা বিরক্তি প্রকাশ করা আসক্তির একটি স্পষ্ট লক্ষণ।
সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সামাজিক দক্ষতা গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু মোবাইলে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে শিশুরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের সঙ্গে কম মেশে। ফলে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, সহমর্মিতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিশু বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রেও মোবাইল আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেম বা ভিডিওতে সময় নষ্ট করে। এর ফলে তাদের শিক্ষাগত অর্জন কমে যায় এবং শেখার আগ্রহ হ্রাস পায়। দ্রুত বিনোদনের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় তারা বই পড়া বা গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয় এমন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ ছাড়া ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন ঝুঁকিও শিশুদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অনুপযুক্ত কনটেন্ট, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার শিশুদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। অনেক সময় তারা না বুঝেই এমন তথ্য বা যোগাযোগের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তানকে ব্যস্ত রাখার সহজ মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ব্যবহার না করে তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। শিশুদের কথা শুনতে হবে, খেলাধুলায় উৎসাহ দিতে হবে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে, যেমন খাবারের সময় বা ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার না করা। দ্বিতীয়ত, শিশুদের বিকল্প বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া, চিত্রাঙ্কন, বাগান করা কিংবা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ যেমন ঘটবে, তেমনি মোবাইলের প্রতি নির্ভরশীলতাও কমবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল সচেতনতা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি সম্পর্কেও অবহিত করতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে শিশুদের আচরণগত পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা এবং শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে সহায়ক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সচেতন ও সম্ভাবনাময় আগামী প্রজন্ম।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
"





































