মোতাহার হোসেন

  ২৭ আগস্ট, ২০২৪

দৃষ্টিপাত

অর্থনৈতিক সংকট বহুমাত্রিক, উত্তরণের উপায়

বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের আবর্তে পতিত দেশ। বহুমাত্রিক এই অর্থনৈতিক সংকটে দেশে শিল্পায়ান, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে। এ কারণে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে ভোগ্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানি নির্ভরতাও বেড়েছে কয়েক গুণ। দেশের ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনা, ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থের লুটপাট, ডলারের চড়া মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স ঘাটতি, পণ্য আমদানির নামে অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে মুদ্রা পাচার প্রভৃতি কারণে অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার। মূল্যস্ফীতিতে দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তসহ সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় কষ্ট সইতে হয়েছে। যদিও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে ‘বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেশি’ এবং রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করা হতো। বাস্তবে বিগত সরকারের চত্রছায়ায় থাকা শীর্ষপর্যায়ের ৫/৬ জন শীল্পপতির হাতে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের আমদানি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন, সরবরাহ এবং দাম নিয়ন্ত্রণ হওয়ায় বাজার পরিস্থিতি ছিল সর্বসাধারণের নাগালের বাইরে।

বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সর্বাধিক বিশৃঙ্খল ও অব্যবস্থায় নিপতিত ছিল ব্যাংক খাত। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংক পরিচালিত হয়েছে গোষ্ঠী স্বার্থে। জনগণের টাকার হরিলুট হয়েছে এসব ব্যাংকে। ব্যাংককে বলা হয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আমাদের অর্থনীতির এই চালিকাশক্তির প্রাণ যায় যায় অবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাই মনে হয়।

ব্যাংকগুলোর অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বিভাগের তৈরি করা প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর মধ্যে মাত্র ৮টি স্থানীয় ও ৮টি বিদেশি ব্যাংকের অবস্থা সন্তোষজনক বলা হয়েছে। অর্ধবার্ষিক আর্থিক কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসূচক প্রস্তুত করেছে বিভাগটি। তাদের প্রতিবেদন বলছে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ ৯টি ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক। ব্যাংকগুলো হলো, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পদ্মা, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। মূল্যায়িত ৫৪ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ১২টির অবস্থা নাজুক, যার মধ্যে ৯টি ‘রেড জোনে’ চলে গেছে। ব্যাংকগুলোকে কর্মদক্ষতার ওপর তিনটি জোনে ভাগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লাল, হলুদ ও সবুজ ‘জোন’। সবুজ অঞ্চলে থাকা ১৬টি ব্যাংক কার্যক্রম ভালো। হলুদ অঞ্চল হলো ভালো-মন্দ মিলিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, হলুদে অবস্থানরত ২৯টি ব্যাংকের স্বাস্থ্য দুর্বল। এ সংখ্যার মধ্যে ২টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, ১৯টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ৮টি শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাণিজিক ব্যাংক। আর লাল তো রোগাক্রান্ত। মানে ভঙ্গুর।

অন্যদিকে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিবর্তনের হাওয়ায় অস্থির হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং খাত। একের পর এক বাণিজ্যিক ব্যাংকে চলছে ক্ষোভণ্ডবিক্ষোভ। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে দখল হওয়া বিভিন্ন ব্যাংক ফেরত পেতে পুরোনো উদ্যোক্তারা তৎপর হয়ে উঠেছেন। কোনো কোনো ব্যাংক মালিকদের মধ্যে চলছে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। আবার দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন কোনো কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমনিতেই অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্যসহ নানা সংকট চলছে। তার ওপর নতুন এই অস্থিরতা যুক্ত হয়ে দেশের ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়াবে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে দখল, অবৈধ নিয়োগ-পদোন্নতিসহ যেসব অন্যায়-অবিচার ঘটেছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার প্রতিকার করা দরকার।

দেশের ব্যাংক খাত সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণায় বলা হয়, ‘ব্যাংকিং সেক্টর থেকে লুটেরা চক্র গত এক দশকে রুটে নিয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। সিপিডি বলেছে, এত দিন বিশেষ ব্যক্তি ও কিছু শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও আইনের প্রয়োগ না করে বিশেষ গোষ্ঠীর তোষণ করেছে। ফলে গত এক দশকের বেশি সময় ব্যাংক খাতে ২৪টি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটেছে। এসব কেলেঙ্কারিতে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে। অতিদ্রুত এ খাতের সংস্কার ও জাল-জালিয়াতির বিচার করতে স্বাধীন ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে সিপিডি।

সম্প্রতি রাজধানীতে ‘ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনা, শিগগির কী করতে হবে’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে দেশের আর্থিক খাতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। এ সময় বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে লাইসেন্স পাওয়া তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের কিছু ব্যাংক মৃতপ্রায় হয়ে আছে। এগুলোকে জনগণের করের টাকায় বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এতে শুধু অর্থের অপচয় হচ্ছে। এসব ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাক বা এগুলো পুনর্গঠন করা হোক। এ ছাড়া কিছু ব্যাংকের পারফরম্যান্স খারাপ, আরেকটু ধাক্কা লাগলেই পড়ে যাবে। এগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে পরিচালনার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

দেশের ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করতে ব্যাংক কমিশন গঠন করার সুপারিশ জোর করেছে সিপিডি। তারা বলেছে, ব্যাংক খাতে দ্বৈত প্রশাসন চলছে। এটি বন্ধ করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এ ছাড়া কোনো ধরনের বিবেচনা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। ইতিমধ্যে যেসব লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও পর্যালোচনা করতে হবে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ১২ শতাংশ বা জিডিপির ২ শতাংশের সমান। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালে এ সময়ে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোর পুঁজির জোগান দিতে সরকারকে সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। অন্যদিকে, গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির এক রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে ৪৭০০ থেকে ৬৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বহু অনিয়ম করা হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা হয়েছে, একটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট পুঁজির এক-চতুর্থাংশের বেশি। আবার ২০১৭ সালে দেশের একটিমাত্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাবে সাতটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করার জন্য সিআইডি ৭৯ বার সময় নিয়েছে। ওই তদন্ত প্রতিবেদন উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার। ২০১২ সালের হল-মার্কের ঋণ কেলেঙ্কারিতে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা দুর্বল ছিল, এখনো বিভিন্ন ব্যাংকে তা রয়ে গেছে।

২০২১ সালের তথ্যানুসারে ১১টি ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত গবেষণা করে শক্তিশালী প্রশাসক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। অনেকগুলো মৃতপ্রায়। এগুলো বেঁচে থাকার কথা নয়। ওইগুলো বন্ধ করা উচিত। যেগুলো দুর্বল রয়েছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে যথাযথভাবে ঠিক করা না হলে সক্রিয় করা সম্ভব নয়। অনেক আর্থিক মামলা আদালতে নিষ্পত্তির জন্য পড়ে আছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক আদালতে মামলার সংখ্যা ৭২ হাজার ৫০০টি। টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে আর্থিক কেলেঙ্কারি খুঁজে বের করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২৪টি আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে, যার পরিমাণ ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।

প্রত্যাশা, বিগত বছরগুলোয় বড় বড় অন্তত ২৪টি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িতদের বিচার চেয়েছে সিপিডি। ১৫ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য অনেক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংকের ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়, বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়