আলমগীর খোরশেদ

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

গাঁও গেরামের কথা

একদম গ্রামের পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা। একটু বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখেছি, দেখতাম চৈত্র-বৈশাখ মাসে গ্রামে প্রচণ্ড অভাব। দিনমজুরদের কোনো কাজ থাকত না, ফলে অভাবে পড়ে খেয়ে না-খেয়ে থাকত।

‘চৈত মাইয়া টানা’ বলতে একটা কথা ছিল তখন। অভাবী মানুষগুলো ভাতের পরিবর্তে গেচু আলু, কলাগাছের মোচা, শাপলা ফুলের গাছ সিদ্ধ করে খেত। খুদের ঝাও, কাউনের ঝাও খেত। তখন লোকজন বাড়িতে টয়লেট বানাত না। জমির আইল, জঙ্গল অথবা মাটি গর্ত করে ওপরে বাঁশের ছাউনি দিয়ে টয়লেট বানানো হতো।

সারা গ্রাম হাঁটলেও তখন বিল্ডিং বাড়ি চোখে পড়ত না। ছনের ছাউনি দিয়ে ও পাটশোলার, বেড়াটিনের ঘরই ছিল বেশি। রাতে বেশির ভাগ মানুষ পা ধুতো না। এভাবেই শুয়ে পড়ত। তখন গাছ কাটা, ঘরের কাফ তৈরিতে করাতি লাগত। করাতিরা চার-পাঁচজন মিলে ঘুরে ঘুরে কাজ খুঁজত। যে বাড়িতে কাজ করত, সে বাড়িতেই থাকা-খাওয়া চলত। শীতের শুরুতে গ্রামকে-গ্রাম কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাব হতো। লোকজন বলাবলি করত, শেষ রাতের দিকে, তিন ঠ্যাংওয়ালা একটা সাদা ঘোড়া দৌড়ে যেত। ঘোড়া যেদিক দিয়ে যেত, কলেরা রোগ হয়ে যেত সেসব মানুষের। মানুষ বল্লম, তির ও লাঠিসোটা নিয়ে পাহারা দিত।

বলত, ‘আলীর হাতে জুলফিকার মায়ের হাতে তির, যে

দিকেত্ তে আইছো গো বালা, সেদিকে তে ফির।’ সবাই জোরে চিৎকার করত।

চৈত্রে অসহনীয় গরম, সঙ্গে অনাবৃষ্টি। কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম। তখন গ্রামের লোকজন দল বেঁধে ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, ছায়া দেরে তুই আল্লাহ’ বলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে টাকা-পয়সা, ধান জোগাড় করত। পরদিন সকালে জমিতে অনুষ্ঠান। বড় দুটি ব্যাঙ ধরে এনে বিয়ে দিয়ে দিত।

গ্রামে দেখতাম, কারো কিছু চুরি গেলে পিতলের বাটিতে তুলারাশির একজনকে তাবিজ নিয়ে ধরলেই বাটি দৌড়াতে থাকে। কাউকে সাপে কামড় দিলে গ্রামের লোকজন কাঁচামরিচ খেতে দিত। ঝাল লাগলে বিষ নেই। কোনো কবরস্থান, বড় শিমুলগাছ, গাবগাছ দেখলেই ভয় লাগত, ভূত আছে কি না। কোথাও থেকে মাংস রান্নার সুবাস এলে বলত, ‘তাড়াতাড়ি থুথু ফাল, শয়তানে রানতাছে।’ ছোটবেলায় শুনতাম, মাছ খাওয়ার চেয়ে গরুর মাংস ভালো। কারণ, গরুর মাংস খেলে ভূত আসতে পারে না।

তিন হাইঞ্জেয়া মানে মাগরিবের সময় আজানের আগমুহূর্ত। আম্মা বলতেন, ‘তিন হাইঞ্জেয়া আর সুবহে সাদিক- এই দুই টাইমে শয়তান ঘুইরা বেড়ায়। ঘরতে বাইর অইস না।’

আর ওই সময়েই আমার টয়লেট চাপত, তখনই আম্মার কথা মনে পড়ত। যদি বাইর অইয়া দেহি, শয়তান আসমান আর মাডি জুইড়া কারাইয়া রইছে, ওরে বাবারে, আমি শেষ। বসে থেকে মনে মনে বলতাম, আমার আগা ধরিস না, বুড়ির আগা ধর। ভাবতাম, সেই বুড়ি কি আসলেই আগা ধরছে এতক্ষণে?

গোয়াল তার কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে ডাক দিত, গরুর চিকিৎসা লাগবে কি না। গ্রামে কারোর গরু মারা গেলে গোয়াল এসে চামড়া তুলে নিত। গোয়ালকে সবাই দোষারোপ করত যে, ‘ওই বেটাই গরুকে মেরে ফেলে, চামড়া নেবার লোভে।’

তখন আমরা গ্রামে এখনকার মতো কিছুই পেতাম না। কাঠপেনসিল বা শ্লেটে লিখতাম। কলম কিনে দিত না। একটু বড় হয়ে দোকান থেকে রঙের চাকতি কিনে আনতাম। চাকতিগুলো বিভিন্ন কালারের হতো। এগুলো পানিতে ঘুলিয়ে কালি বানাতাম, তারপর পাটশোলা বা বাঁশের কঞ্চি ধার করে কেটে কলম বানাতাম। এই কলম বারবার কালিতে ভিজিয়ে লিখতে হতো। তারপর ক্লাস ফাইভে যখন, তখন ফাউন্টেনপেন কিনে দেন আব্বা। ফাউন্টেনপেনে কালি ঢোকাতে হতো। কালির দোয়াত কিনতাম। পরীক্ষার সময় কালির দোয়াতও নিতাম সঙ্গে, যদি কালি শেষ হয়ে যায়?

দুধমলাই আইসক্রিম নিয়ে আসত সাইকেলের পেছনে ছোট একটা বাক্সে। আইসক্রিম... আইসক্রিম, বলে ঘণ্টি বাজাত আইসক্রিমওয়ালা। আগে থেকে গাছের সুপারি, ধান জমিয়ে রাখতাম, পাঁচটা সুপারি দিয়ে একটা আইসক্রিম দিত।

মিষ্টিওয়ালা কাঁধে ভার নিয়ে আসত বিভিন্ন খাবার, মিষ্টি, মুরালি, তিল্লোয়া, বেলুন এসব নিয়ে। ধান দিয়ে গজার খেতাম, সন্দেশ দিত সুপারির বিনিময়ে। মাঠা, খিসসা খেতাম গরমের দিনে।

আমরা যদি রাতে খেতে না চাইতাম, আম্মা বলতেন, ‘এক রাইত না খাইলে এক চড়ুই পাখির শরীরের গোশতের সমান গোশত কমে যায়।’ অথবা বলতেন ‘তাড়াতাড়ি খা, আইজ্জোয়া তুফান আইব।’ ভয়ে খেয়ে নিতাম, তারপর একটু পরপর আম্মাকে জিজ্ঞেস করতাম, কই আম্মা, তুফান তো আইল না। ‘আইব কেমনে, তুফান তো আইত চাইছিন, আল্লাহ বইলা দিছে, যারা আম্মু-আব্বুর কথা শুনে, তাদের দিকে যেও না।’

গ্রামে কবরস্থান, শ্মশান, জঙ্গলে বড় গাছ এসবে ভয় পেলে বলত, ‘তাফা খাইছে, ভূতের পাঁচ আঙুলের দাগ শইল্লের মধ্যে অহনো আছে।’ ভয়ে কবরস্থানের দিকে যেতাম না কখনো।

প্রায় বাড়িতেই দেখা যেত, বাড়িতে ঢোকার গেটে নতুন মাটির ঢাকনা টানিয়ে রাখত। ঢাকনায় আরবিতে লেখা থাকত। এটা নাকি বাড়ি-বন্ধন। সমস্ত বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবে বাড়িকে।

গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। কুপিবাতি আর হারিকেন ছিল ভরসা। রাতে কুপিবাতি পিঠা কুঠার গাঁইলে রাখা হতো।

কয়েকজন একসঙ্গে বসলে, কেউ যদি নতুন জামা, জুতা এসব পরে আসত, তাকে সবাই ছেঁকে ধরত। ‘মিলাদ দে, নতুন জিনিসের।’

ভূত মানেই সাদা কাপড় পরা নারী, এটা কমন ছিল গ্রামের আড্ডায়।

আমরা বেশ বড় হয়েও জন্মদিনের পোশাকে গোসল করতাম। আমাদের পুকুরের ওপর ঝুলে থাকা চম্পাবতী ফুলের বড় গাছ ছিল। আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে গাছের উঁচু ডালে উঠে লাফ দিয়ে পানিতে পড়তাম। এটা যে কী আনন্দ, না করলে বুঝবে না কেউ।

গ্রামের বিয়ে খুব আচার, রীতি, সংস্কার মেনে হতো। অনেক রাতে বরযাত্রী আসত বর নিয়ে। কলাগাছ বা যাদের সামর্থ্য আছে, তারা বাঁশের তৈরি গেটে বর আটকাত। গেটে টাকা নিয়ে খুব তর্কবিতর্ক হতো। মজাও ছিল বেশ। সারা রাত বিয়ের গীত গাইত মেয়েরা। ‘দুই হাতে দুই চান্দের বাতি, সারা রাতি জ্বলছে, কইনছেন জামাই আইতে কেন এত দেরি অইছে।’

শীতের সময় গ্রামে খুব ভোরে উঠে খড়, গাছের পাতা এনে আগুন জ্বালানো হতো। সবাই আগুনের চারপাশে গোল করে বসে আগুনের তাপ পোহাত।

জাম্বুরা দিয়ে বল বানিয়ে আমরা বৃষ্টিতে ফুটবল খেলতাম। কাদায় লুটোপুটি একেবারে।

গ্রামে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিলই না। একজন কবিরাজ ও একজন হোমিও ডাক্তার ছিলেন। আমি যখন ক্লাস নাইনে, আমার টাইফয়েড হয়। কবিরাজি চিকিৎসা চলে আঠারো দিন। আমার অবস্থা কাহিল। একটা ট্যাবলেট কিনতে ও থানা শহরে যেতে হতো।

জঙ্গলে জলাশয়সহ বেশ কয়েকটি শিমুলগাছ, শেওড়াগাছ ও বেতের ঝোপ ছিল। প্রায় রাতেই এই ঝোপ থেকে দুটি বা তিনটি লাইট বের হয়ে শ্মশানের দিকে চলে যেত। দেখে সারারাত ও আর ঘর থেকে বের হতাম না।

বাড়িতে আব্বা অনেক আখ করতেন। আট-দশ খানি জমিতে। বাবুই পাখি থাকত আখখেতে। রাতে জাল নিয়ে আখখেতের মাঝখানে জাল ওপরে উঠিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। অন্য পাশ থেকে পাখিদের ধাওয়া দিত, ফলে বাবুই অন্ধকারে উড়ে এসে জালে বসত। তখনই জাল প্যাঁচ করে পাখিটাকে ধরে লুঙ্গির খুচ্চের ভেতর রেখে দিতাম।

গাঁয়ের সেই বিদ্যুৎবিহীন ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ, আম্মার পেছন পেছন কুপিবাতি নিয়ে ঘুরতাম, কখন আম্মা শুতে যাবেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার সময়ও আম্মাকে ছাড়া শুতাম না। কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো?

যারা মরে যায়, পৃথিবী থেকে কোথায় যায়? সৌরজগৎ, ব্ল্যাকহোল, বিগ ব্যাঙ, কোন বলয়ে গেলে পাওয়া যাবে?

যে মানুষটা মনের সব আবেগজুড়ে ঠাঁই নিয়ে হঠাৎ হারিয়ে গেল, তার সঙ্গেও দেখা হয় না, কথা হয় না সারা জীবন। এটা কেমন সামাজিক রীতি-নীতি? যার চিন্তায় নির্ঘুম কত রাত, কত কথা, কত স্মৃতি, কেমন আছে সে, কয়টা বেবি? বর কেমন আদর করে? কিছুই জানা হয় না। বাবা-মা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়ে কি দূর আকাশের শুকতারা হয়ে আছেন? আমার নিঃশব্দ কষ্টগুলো বাবা-মা কি বুঝতে পারেন, এতদূর আকাশের তারা হয়ে? জানা হয় না কিছুই।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close