রাজা অষ্টম হেনরি

হাফিজ উদ্দীন আহমদ

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বিলাতের এনএইচএসের সিনিয়র কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট আমার চাচা ডা. এম এ লতিফ, তকদির ওয়ালা লোক। যে রাতে পাকিস্তানিরা বাঙালি পেলেই হত্যা করছে, সে রাতে হত্যাযজ্ঞের ঠিক আগ মুহূর্তে মানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টার আগে, লাহোর সেক্রেটারিয়েটের মেডিকেল অফিসার চাচা আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকা পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে বিলাত চলে গেলেন পড়তে। যাওয়ার পরই দেশের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে পেয়েও গেলেন সঙ্গে সঙ্গে। সারের হ্যাম্পটনে সেই চাচার বাসায় সবাই মিলে বেড়াতে এসেছি আজ। দুপুরে খাবার পর চাচা অষ্টম হেনরির প্রাসাদ ১৫১৫ সালে তৈরি লাল ইটের বিশাল হ্যাম্পটন কোর্ট প্যালেস দেখাতে নিয়ে এসেছেন। গেটের একপাশে সিংহ, অন্যপাশে রাজমুকুট ধরা উদ্ধত অশ  আর শীর্ষে উড়ছে রাজকীয় পতাকা। মূলত পোপের মন্ত্রণা সভার সদস্য থমাস উওলসের জন্য বানানো এই জাঁকালো প্রাসাদে নাট্যশালা, অতিথিশালা বা হোটেলও আছে। ঘুরতে ঘুরতে সৌন্দর্যে যখন বিমোহিত হচ্ছি, হঠাৎ সরব হলেন তিনি।

: হেনরির ছয়জন স্ত্রী ছিল জানো হাফিজ?

: আই নো বড়ো আব্বা, হি মার্ডার্ড হিস্ ওয়াইফ।

প্রশ্নটা লুফে নিল পার্লের দশ বছরের মেয়ে ফাইহা। স্কুলের বইয়ে পড়েছে সে।

১৪৯১ সালের ২৮ জুন গ্রিনউইচের প্লাসেনটিয়া রাজপ্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পোশাক পরিহিত এই রাজা। হেনরি-৭ মারা গেলে নাচগান, খেলাধুলা, শিকার ইত্যাদি আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকা ১৭ বছরের এই তরুণ সিংহাসনে আরোহণ করেন। টিউডর বংশের দ্বিতীয় এ রাজাকে নিয়ে বহু নাটক ও সিনেমা হয়েছে। তার ছয় স্ত্রীর ভাগ্য মনে রাখতে বিলাতের ছাত্ররা ছড়া বানিয়েছে: Divorced, Beheaded, Died/Divorced, Beheaded, Survived.

সিংহাসনে আরোহণ করেই হেনরি তার পরলোকগত ভাইয়ের স্ত্রী আর্গনের ক্যাথরিনকে বিয়ে করেন। চার মাস পরই ক্যাথরিন গর্ভবতী হন এবং একটি মৃত মেয়ে প্রসব করেন। ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে আবার গর্ভবতী হয়ে একটি ছেলে জন্ম দেন কিন্তুদুমাস পর সে মারা যায়। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে আবার একটি মৃত ছেলে হয় তার। ১৫১৫-তে আরো একটি ছেলে জন্ম নিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টা জীবিত ছিল। ১৫১৬-তে অবশেষে একটি সুস্থ মেয়ে জন্মে। এর দুবছর পর আবার একটি মেয়ে জন্মে অল্প কিছুদিন বেঁচে থাকে। পুত্রসন্তানের জন্য পাগল হেনরি বিয়ের ২৩ বছর পর তাকে ছেড়ে দেন। বলেন, ও বুড়ি হয়ে গেছে আর সন্তান হবে না। এই বলে জোর করে চার্চের অনুমোদন আদায় করেন বাইবেলের একটি উক্তি উদ্ধৃত করে: If a man takes his brother’s wife, it is an impunity, he hath uncovered his brother’s nackedness. They shall be childless. এর মধ্যে এনি বলিনের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন অষ্টম হেনরি। তারও যদি এই দশা হয়, এজন্য এনি খুব একটা রাজি না থাকলেও ২৩ মে ১৫৩৩ আর্চ বিশপ দ্বারা আগের বিয়ে খারিজ করে ২৮ মে ১৫৩৩ সালে এনিকে জোর করে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন রাজা। সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে ছিলেন এনি, ফ্রান্সসহ ইউরোপ থেকে শিক্ষালাভ করেছিলেন তিনি। তার প্রাণবন্ত ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করত এবং বাবা ছিলেন স্যার থমাস কলিন্স এবং মা লেডি এলিজাবেথ বলিন। এনির বয়স ছিল মাত্র ১৬। কিছুদিনের মধ্যেই তার একটি কন্যাসন্তান জন্মালে রাগে ফেটে পড়লেন হেনরি। কীভাবে দ্বিতীয় স্ত্রী থেকে মুক্ত হওয়া যায় চিন্তা করে মিথ্যা ব্যভিচার, রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, ডাকিনী বিদ্যার অভিযোগ এনে ১৫৩৬ সালের ১৯ মে টাওয়ার অব লন্ডনে তার শিরচ্ছেদ করেন। তবে তার মেয়ে এলিজাবেথ-১ পরে ইংল্যান্ডের একজন বিখ্যাত রানি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। ১৫৫৮ থেকে ১৬০৩ পর্যন্ত তিনি রানির আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অবিলম্বে তৃতীয় বিয়ে করেন হেনরি। এবার যাকে বিয়ে করেন তার নাম ছিল জেন সেমুর। হতভাগা স্ত্রী মাত্র এক বছরের মাথায় হ্যাম্পটন কোর্টে বহু কাক্সিক্ষত পুত্রসন্তান জন্ম দিয়ে প্রসবজনিত জটিলতায় মারা যান। ১৫৩৬ থেকে ১৫৩৭ পর্যন্ত রানি ছিলেন তিনি। পুত্রসন্তানটি পরে রাজা ষষ্ঠ এডওয়ার্ড হয়েছিল। এরপরই একটা ছবি দেখে খুব মুগ্ধ হলেন তিনি। ছবিটা ছিল ক্লিভসের এনির। সঙ্গে সঙ্গে তাকে বিয়ে করে ফেললেন। ক্লিভসের ডিউক তৃতীয়জন এবং জুলিচবার্গের মারিয়ার সন্তান ছিলেন তিনি। জন্মেছিলেন জার্মানির ডাসেলড্রফে। প্রাসাদে নিজের কাছে পাওয়ার পরই রাজার মনে হলো, সে আসলে তত সুন্দরী নয়। অল্পদিনের মধ্যেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটালেন তিনি। এনি মাত্র ১৫৪০-এর ৬ জানুয়ারি থেকে ১৫৪০-এর ৯ জুলাই পর্যন্ত রানির আসনে ছিলেন। ৯ জুলাই এনিকে ছেড়ে ২৮ জুলাই কয়েক দিনের ব্যবধানেই সারির ওটল্যান্ড প্রাসাদে ক্যাথরিন হাওয়ার্ডকে বিয়ে করেন পঞ্চম স্ত্রী হিসেবে। তিনিও সম্ভ্রান্ত বংশের অর্থাৎ লর্ড এডমন্ড হাওয়ার্ডের দশম সন্তান ছিলেন। বিচ্ছেদের আগেই রাজা ক্যাথরিনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। প্রথম ১৪ মাস ভালোই কাটল। ১৫৪১-এর নভেম্বরে হেনরি যখন রাজকীয় প্রার্থনালয়ে প্রার্থনারত ছিলেন, কেউ এসে জানাল অপ্রাপ্ত বয়স্ক ক্যাথরিনের আগে ফ্রান্সিস ডেরহাম নামে একজন তরুণ গানের শিক্ষকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্ত্রীকে গ্রেফতার করলেন। স্ত্রী পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে তখনই দৌড়ে প্রার্থনালয়ে গিয়ে তার প্রাণভিক্ষা চাইলেন। কিন্তুহেনরি তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন। তারপর দ্বিতীয় স্ত্রীর মতো টাওয়ার অব লন্ডনে তার শিরচ্ছেদ করলেন। এরপরও মেয়েরা কেন তাকে বিয়ে করেছে জানি না। সম্ভবত রাজার ইচ্ছাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। ১৫৪৩-এর ১২ জুলাই এবার ক্যাথরিন পারকে বিয়ে করেন। ক্রমে তিনি বৃদ্ধ ও অসম্ভব মোটা হয়ে পড়েন। ১৫৪৭-এর ২৮ জানুয়ারি লন্ডনের হোয়াইট হল রাজপ্রাসাদে হেনরি-৮ মারা যাওয়ার এক বছর পর পর্যন্ত ষষ্ঠ রানি বেঁচে ছিলেন।

হেনরির নিষ্ঠুরতার কথা চিন্তা করলে হৃদয় শুধু কেঁপে উঠে না, তার অসহায় স্ত্রীদের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করলে রক্তাক্ত হয় বেদনায়। শিরচ্ছেদ করা স্ত্রীদের মাথা বর্শা বিদ্ধ করে লন্ডন ব্রিজে জনগণকে প্রদর্শন করা হতো। অথচ দেখলাম প্রাসাদের অদূরে ৬০ একর জমিতে বানিয়েছেন বিশাল গোলাপের বাগান। গোলাপ ঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে রোমান ধাঁচে নান্দনিক সব মার্বেলের ভাস্কর্য: একটি নগ্ন দরিদ্র নারী তার এক নগ্ন সন্তানকে স্তন পান করাচ্ছে অপর নগ্ন সন্তানটি মাকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অপর এক স্থানে ফুল হাতে একটি নারী মূর্তি। পায়ের কাছে শান্ত ভঙ্গিতে বসা গোবৎস। এমনি আরো অনেক। এ রকম নিষ্ঠুর রাজা গান লিখে আবার সুরও দিয়েছেন। বিলাতের লোক তাকে মনে রেখেছে আধুনিক ব্রিটেনের নির্মাতা হিসেবে। চার্চ অব ইংল্যান্ডকে তিনি রোম থেকে আলাদা করায় তারা খুশি কিন্তুআসলে এটা তিনি করেছিলেন নিজের স্ত্রীকে অন্যায় তালাক দেওয়ার অধিকার আদায় করতে। অবশ্য সমকামিতার শাস্তি ঘোষণা করেছিলেন মৃত্যুদণ্ড।

 

 

"