নিজস্ব প্রতিবেদক
যমুনায় হচ্ছে চার লেনের রেল সেতু

পদ্মা নদীর ওপর যেভাবে লালন শাহ সড়ক সেতু ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রেল সেতু অবস্থান করছে, তেমনভাবেই যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে নতুন একটি রেলসেতু তৈরি করা হবে। এজন্য ইতিমধ্যেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি এতে ঋণ দেবে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুকে রক্ষা করতেই এর পাশে আলাদাভাবে চার লেনের এই ডুয়েলগেজ রেলসেতু নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বুধবার এ তথ্য জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শশী কুমার সিংহ। তিনি বলেন, বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন চলাচল করছে। সেতুর ওপর ধীরগতিতে রেলপথে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়াও আমরা ভারী পণ্য পরিবহন করতে পারছি না। ফলে যম?ুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশ দিয়ে আলাদা রেলসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা ইতিমধ্যেই জাইকার কাছ থেকে ঋণ পেতে যাচ্ছি সেতুটি নির্মাণে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি পাশ করানো হবে। এই বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আশ্বাস পাওয়া গেছে। আধুনিক সকল সুযোগ ?সুবিধার সমন্বয়ে নির্মিত হবে রেলসেতুটি। বঙ্গবন্ধু সেতু ইস্ট (বিবিই) স্টেশন এবং বঙ্গবন্ধু সেতু ওয়েস্ট (বিবিডাব্লিউ) স্টেশন স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলিংকিং (সিবিআই) সিগনালিং সিস্টেম থাকবে। সেতু বরাবর গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইনও থাকবে। যেটি সম্পূর্ণভাবে নির্মিত হলে উত্তর বঙ্গ, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে আশির্বাদ হিসেবে ধরা দেবে বলে মনে করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ হাজার ৭৪০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২০১ কোটি ৫৭ লাখ এবং প্রকল্প সাহায্য ৭ হাজার ৭২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে জুলাই ২০১৭ সাল থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ সাল নাগাদ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বছরওয়ারী প্রকল্পটির জন্য টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করবে সেতুটি। ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) ভুক্ত চারটি দেশের সঙ্গে রেলপথে ব্যবসা বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। ভারত, মায়ানমার, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন হবে।
রেল মন্ত্রণ?ালয় থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, বিশেষভাবে যমুনায় রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাসে জাপান সফরে গিয়ে ছিলেন। সেই সময় প্রকল্পটির বিষয়ে দুদেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। প্রকল্পের তাৎপর্য এবং গুরুত্বের কথা বিবেচনা এবং বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে জাইকা ঋণ দিতে সম্মত হয়।
মহাসড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই রেলসেতু হবে চারলেন ডুয়েলগেজ। যাতে করে ওয়াগন ও কন্টেইনার বাল্ক অধিক পরিমাণে বহন করা যায়। ফলে উত্তরবঙ্গ, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ নিরাপদ ও দ্রুতগামী ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা পেতে যাচ্ছে। বর্তমানে রেলপথ মন্ত্রণালয় ‘যমুনা রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্প’ তৈরির কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। যাতে করে প্রকল্পের কাজ দ্রুত সময়ে শুরু করা যায়। কারণ বর্তমানে যাত্রীবাহী ছাড়া কোনো ভারী মালবাহী ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর দিয়ে চলাচল করতে পারছে না। যমুনায় নতুন রেলসেতুটি হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত হবে। একই সঙ্গে রেলপথের মাধ্যমে ভারী মালামাল পরিবহনে কন্টেইনার পরিবহন বাড়ানো হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কন্টেইনারসমূহ দেশ-বিদেশে পরিবহন বাড়ানো হবে। এতে করে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়বে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দ্রুতগামী রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নতুন রেলসেতুর মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ ব্যবস্থা করা হবে। কন্টেইনার পরিবহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়ানো হবে।
বঙ্গবন্ধু সেতু বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দুই অংশকে একত্রিত করেছে। সড়কের পাশাপাশি সেতুতে রেল সংযোগও রয়েছে। তবে এই রেল সংযোগ বর্তমানে না থাকার সমতুল্য। সেতুতে কচ্ছপ গতিতে চলে ট্রেন। ইচ্ছে করলে কোনো যাত্রী দৌড়ে ট্রেনের আগেই সেতু পার হতে পারবেন। কারণ এর আগে কয়েকবার সেতুতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন যাত্রীরা। ট্রেন আউটার সিগনালিং খাঁচা ভেঙে ফেলেছে দুস্কৃতকারীরা। বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুতে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার রেল সংযোগ এখন এক আতঙ্কের নাম। এই আতঙ্ক থেকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে পরিত্রাণ দিতে এবং বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুকে রক্ষা করতেই এবার আলাভাবে আরো একটি রেলসেতু নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
তবে এর আগে পদ্মাসেতু হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে নতুন রেলওয়ে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) সভা। ডাবল ডেকার পদ্মাসেতুর নিচ দিয়ে চলবে রেল। চলতি বছরের মে মাসে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু সেতুতে কন্টেইনার পরিবহন বন্ধ : বর্তমানে দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে অদূর ভবিষ্যতে দাঁড়াবে ৪ হাজার ৭৩০ কিলোমিটার। গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ২৬টি ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পার হয় কিন্তু ঝুঁকির কারণে সে তুলনায় কন্টেইনারবাহী ট্রেন চলাচল এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ভারী পণ্য পরিবহনে এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ৩০টি ট্রেন চলাচলের একটি পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে থাকবে দুটি কন্টেইনার, একটি পেট্রোলিয়াম ও দুটি খনিজ সম্পদবাহী। ২০৩৩ সালে ৫টি ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৫টি কন্টেইনার একটি পেট্রোলিয়াম ও দুটি খনিজ পণ্যবাহী। ২০৪৩ সালে যমুনা নদীর উপর দিয়ে ৭০টি ট্রেন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি কন্টেইনার, চারটি পেট্রোলিয়াম ও দুটি খনিজবাহী ট্রেন চলাচল করবে।
"




































