reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

রাজশাহীর মিষ্টিতে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত, যেন ‘রসগোল্লা’র বড় সাহেব

প্রথমে খেলেন প্যারা সন্দেশ, এরপর দধিয়া সন্দেশ, তারপর মুণ্ডা। মিষ্টিদই, টকদইও বাদ দিলেন না। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রসগোল্লা’ গল্পে ভেনিসের বড় সাহেবের মতো তিনি আড়াই মিনিট চোখ বন্ধ করে না থাকলেও তার অভিব্যক্তি আর মুখের হাসিই বলে দিচ্ছিল এই সন্দেশের স্বাদ কেমন!

এটি গল্লপ নয়; বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের রাজশাহীর মিষ্টির দোকানে খাওয়ার বাস্তবতা।

ফেসবুকে তিনি দোকানটির ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘রাজশাহীর প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারের মনকাড়া সুগন্ধ আর মিষ্টির প্রলোভন সামলানো সত্যিই কঠিন।’

রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টির স্বাদ অতুলনীয়। ২০১৯ সালের মার্চে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূতও এখানে এসে মিষ্টি খেয়েছেন। এবার এলেন ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনও।

গত মঙ্গলবার দুই দিনের সফরে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসেন এই মার্কিন কূটনীতিক। দ্বিতীয় দিন বুধবার ঢাকায় ফেরার আগে হঠাৎ ‘রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারে’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত। এক ঘণ্টা আগে পুলিশের মাধ্যমে এ খবর পান দোকানের ব্যবস্থাপক।

১৯৩৬ সালে এই মিষ্টির দোকানটি দিয়েছিলেন মারওয়ারী ব্যবসায়ী রামপ্রসাদ আগরওয়ালা। তার বাড়ি ছিল ভারতের জয়পুরে। রাজশাহীর সাহেববাজার ও বগুড়ার সান্তাহারে দুটি মিষ্টির দোকান দিয়েছিলেন তিনি। তখন দোকানের নাম দিয়েছিলেন ‘রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডার’। মালিকানা বদল হলেও আজও দোকানটির নাম বদলায়নি। বহু মানুষ এই দোকান ছাড়া আর কোথাও মিষ্টি কেনেন না। তাদের জিভেয় এই মিষ্টির স্বাদ লেগে আছে।

দেশভাগের পর রামপ্রসাদ আগরওয়ালা ১৯৬৫ সালের দিকে তার কর্মচারী কানাইলালকে দোকানটি দিয়ে তিনি ভারতে চলে যান। তখনো দোকানটি চাটাই দিয়ে ঘেরা, ওপরে টিন।

কানাইলাল ১৯৬৮ সালে সেখানে দোতলা ভবন করেন। নিচতলায় দোকান হয়, দোতলায় তিনি থাকতেন। আর পেছনের অংশে ছিল মিষ্টির কারখানা। ১৯৭৪ সালের দিকে এই দোকানের মিষ্টির নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই একই জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে এই দোকান।

১৯৯৬ সালে কানাইলাল দোকানটি বিক্রি করে দেন রাজশাহী নগরের দরগাপাড়ার ব্যবসায়ী মাহবুব আলমের কাছে। তারপর তিনিও ভারতে চলে যান। ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি ভারতেই মারা যান। কানাইলালের সময় থেকেই এ দোকানের ব্যবস্থাপক গণেশ চন্দ্র পাল। মূলত তিনিই এখনো এই রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারের নামডাক ধরে রেখেছেন।

গণেশ চন্দ্র পাল জানান, তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে এই দোকানে আছেন। ক্রেতাদের তাদের প্রতি যে আস্থা, সেটিই তাদের বড় পাওয়া। তারা খাঁটি ছানা, মাওয়া, পোস্তদানা, চিনি ও নলেন গুড় ব্যবহার করে মানসম্মত মিষ্টি তৈরি করার চেষ্টা করেন। তাই তাদের মিষ্টির এত সুনাম। এখন রোজ পাঁচ থেকে ছয় মণ মিষ্টি বিক্রি করেন তারা। প্রায় ২৪ ধরনের মিষ্টি ও সন্দেশ তারা তৈরি করেন।

তিনি জানান, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাজশাহী সফরে এসেছিলেন। তখন তিনি এই দোকানের মিষ্টি খেয়ে যান। সেই ছবি তারা দোকানে টানিয়ে রেখেছেন। এবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন এসে সেই ছবি দেখে আনন্দিত হয়েছেন।

গণেশ চন্দ্র পাল বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত এলে তাকে আমরা প্যারা সন্দেশ, দধিয়া সন্দেশ, মুণ্ডা এবং দই পরিবেশন করি। তিনি প্রত্যেকটিই খেয়ে দেখেছেন। তারপর খুব প্রশংসা করেছেন।’

দোকানের মালিক মাহবুব আলম বলেন, ‘গণেশ চন্দ্র পালই সব। সে-ই দোকানটি ধরে রেখেছে। তার কারণেই মিষ্টির মান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। আমরা পুরনো কর্মচারীদের দিয়েই দোকানটি পরিচালনা করি। চেষ্টা করি, এতদিনের যে ঐতিহ্য সেটা যাতে অক্ষুণ্ন থাকে।’

রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারের ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে। দেড় বছর হলো সাহেববাজার মুড়িপট্টিতে তাদের আরেকটি শাখা চালু করা হয়েছে। এখন দুই দোকানে ৪৮ জন কর্মচারী কাজ করছেন।

১৯৩৬ সাল থেকেই রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারে সকালের নাস্তা হিসেবে লুচি আর ডাল পাওয়া যায়। ১৯৭৯ সালে গণেশ চন্দ্র পাল যখন দোকানে কাজে যোগ দেন তখন লুচির দাম ছিল ১০ পয়সা, ডাল ফ্রি। এখন লুচির দাম ৬ টাকা, ডাল ফ্রি।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়