মেহেদী হাসান
জলবায়ু পরিবর্তন : বৈশ্বিক সতর্কবার্তা
বাংলাদেশে প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা

জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্স’ (জিসিএইচএ)। প্রতিবেদনটি বৈশি^ক হলেও বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সতর্কতার ইঙ্গিত দিয়েছে। জলবায়ু-সহনশীলতা, রোহিঙ্গা শরণার্থী সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য- এ তিনটি বিষয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আগালে দেশের দুর্যোগ মোকাবিলা আরো নির্ভুল ও নিরাপদ হয়ে উঠবে বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের নতুন বৈশ্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ুজনিত বিপর্যয়, যুদ্ধ এবং ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা একে-অপরের ক্ষতিকে আরো বাড়িয়ে তোলে। সাম্প্রতিক অতিবর্ষণ ও বন্যার তথ্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের আশ্রয়কেন্দ্র, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ত্রাণ তহবিলের ওপর কীভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। দেশের সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে আট দিনব্যাপী প্রবল মৌসুমি ঢলের কারণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোয় ৪৮২টি ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৯ হাজার ৭০৭ জন সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ছিল ২৫৯টি ঝড় বা প্রবল বাতাসের ঘটনা, ১৬৪টি ভূমিধস এবং ৪২টি বন্যা। ৫ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে ৪ হাজার ৩২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৯টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। একই প্রতিবেদনে ৬৭টি পানির উৎস (ওয়াটার পয়েন্ট), ৩৮৭টি শৌচাগার এবং ৫৩টি শিক্ষাকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও উঠে এসেছে। এ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ কোনো এলাকায় হঠাৎ আবহাওয়াজনিত জরুরি পরিস্থিতি কীভাবে দ্রুত জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের এ পরিস্থিতি ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্স’ ওই প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, সশস্ত্র সংঘাত এবং দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মিলে ক্ষতির একটি চক্র তৈরি করে। এ চক্রের কোনটির দুর্বলতা কিংবা ক্ষতি সামগ্রিক ক্ষতিতে রূপান্তর হয়। জুলাই মাসে প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশবিষয়ক কোনো আলাদা অধ্যায় বা দেশভিত্তিক মূল্যায়ন করেনি। তবে কক্সবাজারের দুটি ছবি স্থান পেয়েছে। একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রের এবং অন্যটি এক রোহিঙ্গা মা ও তার নবজাতকের ছবি স্থান পেয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যে সিদ্ধান্ত বা তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা জিসিএইচএর কোনো ‘কেস স্টাডি’ বা নির্দিষ্ট বাংলাদেশকেন্দ্রিক গবেষণা থেকে নয়; বরং প্রতিবেদনটির পাশাপাশি স্থানীয় সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মূল সতর্কবার্তা বিশ্লেষণে দেখা যায়, যা বাংলাদেশকে ইঙ্গিত করে। প্রতিবেশী মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং একইসঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিধস, তীব্র তাপপ্রবাহ ও রোগের ঝুঁকির মুখে রয়েছে বাংলাদেশ।
ইউএনএইচসিআরের ‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৩২ লাখ (১২৩.২ মিলিয়ন)। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মানবিক সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়ে আছে। ২০২৬ সালের ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা)-এর আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ ১৬ লাখ মানুষকে সহায়তা করার লক্ষ্যে ৭ কোটি ১০ লাখ ৫০ হাজার (৭১০.৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের তহবিল চাওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় যুক্ত ৯৮টি সহযোগী সংস্থার মধ্যে ৪৯টিই বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্থা। জুলাই মাসের বর্ষাকালীন হালনাগাদ প্রতিবেদনে জরুরি অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রমের জন্য ৯ কোটি ৮৪ লাখ (৯৮.৪ মিলিয়ন) ডলারের প্রয়োজন চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং ওই অগ্রাধিকারগুলোর ক্ষেত্রে ৪ কোটি ৫২ লাখ (৪৫.২ মিলিয়ন) ডলারের ঘাটতি রয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এটি একটি নির্দিষ্ট জরুরি খাতের ঘাটতি; পুরো ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’র সামগ্রিক অর্থায়নের চিত্র নয়। এ পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এমন একটি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে দাতা সংস্থা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জানা প্রয়োজন যে ঠিক কোন প্রয়োজনগুলো এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জুলাই মাসের জরুরি পরিস্থিতির সময় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় সাময়িক জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও কোনো কেন্দ্র দীর্ঘসময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়নি। এ সময় ১৭টি ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম, ১৩টি মেডিকেল হাব এবং ৩৩টি অ্যাম্বুলেন্সসহ দুর্যোগ মোকাবিলাকারী একটি নেটওয়ার্ককে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এ ব্যবস্থাটি কার্যকর ছিল ঠিকই, তবে এটিকে সচল রাখার জন্য যে মাত্রার প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়েছিল, তা থেকে বোঝা যায় যে জলবায়ু-সহনশীলতা কীভাবে এখন নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, বর্ষাকালে কলেরার ঝুঁকি বারবার দেখা দেয়। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ শনাক্ত করতে এবং প্রাদুর্ভাব সংক্রান্ত তদন্তের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সহযোগী সংস্থাগুলো ‘আর্লি ওয়ার্নিং, অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স সিস্টেম’র (পূর্বাভাস, সতর্কতা ও সাড়াদান ব্যবস্থা) ব্যবহার করছে।
স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ শুধু সংক্রামক রোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে ২০২৫-২৬ সালের স্বাস্থ্য-চাহিদাবিষয়ক এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রতি ১০টি রোহিঙ্গা পরিবারের মধ্যে অন্তত একটিতে কোনো না কোনো সদস্য মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় ১৫০ জনেরও বেশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি আরো ১৫০ জন সম্মুখসারির কর্মীকে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবার ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক রোগী, ওষুধের ঘাটতি এবং বিশেষজ্ঞ সেবার সীমাবদ্ধতা- এসব বিষয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলো এ পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সেখানকার মানুষের বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ ছিল মিয়ানমারে সংঘাত ও নিপীড়ন-বাংলাদেশের জলবায়ু পরিস্থিতি নয়। কিন্তু একবার যখন মানুষ খাঁড়া ঢালযুক্ত, জনাকীর্ণ এবং দুর্যোগঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস শুরু করে, তখন ভারী বৃষ্টিপাত একইসঙ্গে তাদের বাসস্থান, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও চিকিৎসাকেন্দ্রের ক্ষতি করতে পারে। আর এগুলোর যেকোনো একটির অকার্যকারিতা বা বিপর্যয় অন্যগুলোর ওপর চাপ আরো বাড়িয়ে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং অত্যধিক তাপজনিত ধকলের কারণে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
এখানে সময়কালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : এ হিসাবটি মূলত ওই দুই দশকের জন্য একটি পূর্বাভাস বা প্রাক্কলন, বর্তমানের কোনো বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত পৃথক একটি মূল্যায়নে (২০২৫) দেখা গেছে যে, বিশ্বজুড়ে তাপের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বছরে গড়ে ৫ লাখ ৪৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ টিকাদান কর্মসূচি, রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে- ঠিক এমন একসময়ে যখন স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের জাতীয় জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের ঘটনা আরো ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে, তাপমাত্রা নিয়মিতভাবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং ডেঙ্গু শুধু শহরের মৌসুমি সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসে দেশজুড়ে ও বছরব্যাপী এক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। সরকারের ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬’-এ দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, নজরদারি ব্যবস্থা, জনবলের প্রস্তুতি এবং সুশাসনের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় নিরাপদ পানি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বিকল্প বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নজরদারি ব্যবস্থায় স্থানীয় সতর্কবার্তা ও দ্রুত পদক্ষেপের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি এবং প্রস্তুতি পরিকল্পনায় এমন সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাদের বয়স, শারীরিক অক্ষমতা, আয় বা বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে আরো প্রাক্কলন করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৫.৫ শতাংশ আসে সামরিক কার্যক্রম থেকে। এ তথ্যটিকে একটি প্রাক্কলন বা আনুমানিক হিসাব হিসেবেই তুলে ধরেছে- কোনো নিরীক্ষিত বা চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে নয়, কারণ সামরিক খাতের নির্গমন সংক্রান্ত তথ্য অসম্পূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রকৃত মূল্যের হিসেবে বিশ্বের সামরিক ব্যয় ২.৯ শতাংশ বেড়ে ২.৮৮৭ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে; এটি ছিল টানা একাদশ বছরের মতো সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা।
জিসিএইচএর নির্বাহী পরিচালক জেনি মিলার যুক্তি দিয়েছেন, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে সামরিক খাতে স্থানান্তর করা হলে তা ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না’। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে মূল নীতিগত প্রশ্নটি এটা নয় যে, প্রতিরক্ষা খাতের সব ব্যয় অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব কি না; বরং প্রশ্নটি হলো-বিদ্যমান ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভিযোজন এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন করা হচ্ছে কি না। প্রতিবেদনে আরো তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে সংঘাত জ্বালানি ও খাদ্য বাজারের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালী এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ, তবে এর পরিসংখ্যান সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’র তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে এ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের ৮৪ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৮৩ শতাংশ এশীয় বাজারে গেছে।
বাংলাদেশের হাতে এরই মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো রয়েছে : ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা-২০২৬’ এবং রোহিঙ্গা সংকটের মোকাবিলায় ‘যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা-২০২৬’। এখনকার জরুরি কাজ হলো এগুলোর সঙ্গে জেলা পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটানো। কক্সবাজারের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো- ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি মানচিত্র (ম্যাপিং) ব্যবহার করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া; বর্ষা মৌসুমের তীব্রতার আগেই আশ্রয়কেন্দ্র, পাহাড়ের ঢাল, নিষ্কাশন নালা, পানির উৎস ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করা এবং ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা দল ও জরুরি রোগী স্থানান্তরের (রেফারেল) পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখা। এর অর্থ আরো হলো- তহবিলের ঘাটতিগুলো সুনির্দিষ্ট শ্রেণিতে প্রকাশ করা; যাতে দাতারা বার্ষিক সামগ্রিক সহায়তার আবেদনের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক জরুরি প্রয়োজনগুলোকেও আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারেন।
জাতীয় পর্যায়ে এর অর্থ হলো- জলবায়ু-সহনশীল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রস্তুতি, পরিচ্ছন্ন বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি এবং দুর্যোগকালীন সময়েও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম এমন স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনীর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, শরণার্থী এবং স্বল্প আয়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়লেও সবার ক্ষতির মাত্রা সমান হয় না। বৈশ্বিক প্রতিবেদনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এতে ‘নিরাপত্তা’র যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা মানে কেবল সামরিক সক্ষমতা নয়; এটি কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্র, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্থিতিশীল খাদ্য ব্যবস্থা এবং জনগণের আস্থার ওপরও নির্ভর করে।
"









































