নিজস্ব প্রতিবেদক

  ৩ ঘণ্টা আগে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল নিয়ে তৎপরতা ইসির

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বিষয়ে কথা বলতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে খুব শিগগির জাতীয় সংসদের স্পিকারের সাক্ষাৎ চাওয়া হবে। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে সিইসির কক্ষ থেকে বের হয়ে এ তথ্য জানান ইসির সিনিয়র সচিব। কমিশন সার্বিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছে বলে জানা গেছে। এর আগে শুক্রবার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন সাহাবুদ্দিন।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় স্পিকারের সঙ্গে কমিশনের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এজন্য খুব দ্রুতই সময় চেয়ে স্পিকারের কাছে বার্তা পাঠানো হবে। স্পিকারের সাক্ষাতের পর তফসিল ঘোষণার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো চূড়ান্ত করা হবে। নিয়মানুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সিইসি। সেই মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন।

এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বিষয়ে রবিবার সিইসির কার্যালয়ে সব নির্বাচন কমিশনার ও সিনিয়র সচিব অনির্ধারিত বৈঠক করেন। সেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইন নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তফসিল ঘোষণার পরবর্তী কার্যক্রম ঠিক করতে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। নিয়মানুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। যার জন্য সংসদ সচিবালয় থেকে ভোটার তালিকা তথা সংসদ সদস্যদের নাম ইসি সচিবালয়ে পাঠানো হবে। যার ভিত্তিতে ইসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা করবে। এরপর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এসব বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সিইসি বৈঠক করবে।

সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখা সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার সাক্ষাতের জন্য স্পিকারের দপ্তরে চিঠি দেবে নির্বাচন কমিশন। রেওয়াজ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন কায়সার কামাল। এর আগে ২০০২ সালে তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান মারা গেলে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির হন তৎকালীন সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ, পরে তিনি দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হন। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। গত শুক্রবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পেছনে অসুস্থতাকে কারণ দেখানো হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সি সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। সাংবিধানিক নিয়মানুযায়ী ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তার মেয়াদ থাকার কথা থাকলেও দুদিন ধরেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন চলছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ওইসময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি তাকে সঙ্গে সঙ্গে সরানোর পথে যায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তার পদত্যাগ দাবি করেনি। সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।

এরপর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা শুরু হয়। কয়েকদিন ধরে আলোচনার মধ্যে সচিবালয়ে এক বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। রাষ্ট্রপতি লন্ডনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা ফোনে কথা বলেছেন বলে প্রকাশিত খবর নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার দুপুরে নির্ধারিত সফরসূচির দুদিন আগেই দেশে ফেরেন তিনি। এরপরই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের কথা জানা যায়।

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়