সিলেট প্রতিনিধি

  ২৬ জুলাই, ২০২৬

সিলেটে জামায়াত আমীর

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে আন্দোলন তীব্রতর হবে

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, আমরা সারা দেশে ঘুরেছি। মানুষের একটাই চাওয়া, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা হোক। এটা নিয়ে কোনো ধানাই-পানাই চলবে না। আমাদের কথা সাফ, গণভোটকে আমরা অপমান করতে দেব না।

গতকাল শনিবার বিকেল ৫টায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে জুলাই সনদ, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বিশাল জনসভায় জামায়াত আমীর বলেন, এখন যারা সরকারে আছেন, তারাও মজলুম ছিলেন, আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তারা এখন নির্লজ্জের মতো ফ্যাসিবাদের দিকেই যাচ্ছে। তিনি গণভোটের গণরায়কে মেনে নিতে সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, না মানলে এদেশের মানুষ জানে, কিভাবে দাবি আদায় করতে হয়। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রস্তুত হোন সিলেটবাসী, ঢাকার জন্য ডাক আসবে। দুর্নীতি বন্ধ ও ফ্যাসিবাদমুক্ত না করে আমরা থামব না। আমাদের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। ১১ দলের সবাই ঐক্যবদ্ধ। দেশে সুশাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে। তিনি বলেন, ‘রাশেদ প্রধান বলে গেলেন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্ভোগের কথা। অবিলম্বে এ সড়কের কাজ সমাপ্ত করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া হোক। সিলেটে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে, সেটাকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হোক। সিলেটে একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হোক। সাবেক মন্ত্রী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শায়খুল হাদীস আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমীর আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আমজাদুল ইসলাম চান।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে শুনতে পেলাম আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আমরা ভারতের তরুণদের স্বাগত জানাই। দেশে দেশে তরুণরা জেগে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই তরুণদের গড়ে ওঠা নেতৃত্বে সরকার পতন হয়েছে। প্রত্যেক দেশের সরকারই তরুণদের এ আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সম্মান করেছে। শুধু আমাদের দেশেই সরকার তরুণদের আবেগকে মূল্যায়ন করছে না। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জুলাই ভুলে গেছে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি যদি সংস্কার না করে, তাহলে এর পরিণাম তারেক রহমানকে ভোগ করতে হবে। যদি সরকার গণভোটের গণরায়কে বাস্তবায়ন না করে, তাহলে এ সরকারকে আমরা সহযোগিতা করব না। সংস্কার ও সুশাসনের লক্ষ্য ১১ দল ঐক্যবদ্ধ। ‘গণভোটের গণরায়কে বাস্তবায়ন না করলে বিএনপি ৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। দেশে দেশে তরুণদের আন্দোলনে সরকারপ্রধানের যে পরিণতি হচ্ছে, তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি সেই পরিণতি ভোগ করতে চান কি না। গণভোটের গণরায় এদেশের তরুণরা আদায় করেই ছাড়বে’, বলেন তিনি।

আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ‘আজকে যখন ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তি সুশৃঙ্খলভাবে ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে, তখনই ভেতর থেকে একটি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এদেশের নাগরিকদের জন্য স্পষ্ট বার্তা, ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারার জন্য এ ঐক্য হয় না। জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এ ঐক্য শুরু হয়েছিল, যতদিন পর্যন্ত এ দাবি বাস্তবায়ন না হবে, ততক্ষণ আমাদের এ ঐক্য থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা বিভিন্ন সময় রক্ত দিয়েছে। অনেকে শহীদ হয়েছেন। অনেক ভাই-বোন আহত হয়েছেন, এখনো হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। আপনারাও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বড় অংশীদার। সুতরাং জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিএনপির ক্ষতি আমরা চাই না। আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে চাই। আপনারা যদি গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, তাহলে আপনাদের পরিণাম পশ্চিম পাকিস্তান ও আওয়ামী লীগের মতোই হবে। তিনি আরো বলেন, আপনারা পানি ঘোলা করার পর খান। আমরা বলেছিলাম, চুপ্পুকে অপসারণ করুন। আপনারা জল ঘোলা করে খেলেন। সুতরাং বলব, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জল ঘোলা করবেন না। দেশের স্বার্থেই দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন,সরকারের মাত্র পাঁচ মাস অতিবাহিত হচ্ছে, এ সময়ে আমাদের মাঠে থাকার কথা না। কিন্তু বিএনপির ঘাড়ে আওয়ামী লীগ ভর করেছে, যার কারণে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি। এজন্য ১১ দলীয় জোট মাঠে নেমেছে। বিএনপি যদি সংস্কার চাইত, তাহলে অবশ্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিত। এখন সংবিধান সংশোধন করার কথা বলে বিএনপি জনগণকে বোকা বানাচ্ছে। বিএনপি দলীয়করণে আওয়ামী লীগকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে একজন অতিরিক্ত সচিব অবসর নিয়েছেন। অবসরের পর তিনি ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতি করেছেন। গতকাল তাকে আবার সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তাকে দিয়েই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চায়। এগুলো বন্ধ না করলে সরকারকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।

অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই আন্দোলনে হাজার হাজার ভাই-বোন শহীদ হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। আমরা আয়নাঘরে বন্দি ছিলাম। জুলুম-নির্যাতন উপেক্ষা করে জালিম সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৬ বছর মাঠে ছিলাম। আমরা কিন্তু দেশ ছেড়ে যাইনি। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর যাতে কোনো ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে। কোনো ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচারী সরকার যাতে না ফিরে, তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি।

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘আমরা অতীতে দেখেছি, আওয়ামী লীগকে কিভাবে দুবার পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর খেসারত এ জাতিকে দুবারই দিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক আছে, বাংলাদেশের জনগণের সম্পর্ক নেই। বাঙ্গু বুদ্ধিজীবীরা কালচারাল এস্টাবলিশমেন্টের নামে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। জুলাই আন্দোলনে বহু মানুষ জীবন দিয়েছে, তাদের রক্তের সাথে বেঈমানী করা হবে না। যদি সরকার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চায়, তাহলে বলব আপনারা রাজনৈতিক রোজার প্রস্তুতি নেন। যেভাবে ১৭ বছর রোজা রেখেছিলেন।

মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা রাজশাহীতে গিয়েছিলাম, রাজশাহীবাসী গণভোটের গণরায়ের বাস্তবায়ন চায়। আমরা দেশের অন্য অঞ্চলেও গিয়েছি, সেখানেও একই দাবি। আমাদের গণদাবি তারেক রহমান সাহেব বুঝেন না। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে বলছি, আপনার দলের নেতাকর্মীরা জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বললেই পুরস্কৃত করছেন। যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, তারা অবহেলিত।’ তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের অনেক শীর্ষনেতাকে হারানো হয়েছে। গণভোটের গণরায় নিয়ে গড়িমসি করলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘জুলাই রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম জুলাই আন্দোলন। বৃদ্ধ থেকে শিশু আন্দোলনে নামার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। একটি বৈষম্যমূলক দেশ গড়তে এ আন্দোলন গড়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে সুবিধাভোগী বিএনপি। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতি আঁকড়ে ধরতে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। বিএনপির ৩১ দফায় সংবিধান সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন সংবিধান সংশোধনের কথা না মেনে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছেন।’ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তিনিও চান, আমরাও চাই একটি সুশাসনের দেশ। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীকে বলব, কোনো নিয়োগের আগে যাকে নিয়োগ দেবেন, তার ২০ বছরের দুর্নীতির খোঁজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। এটা যদি না করে নিয়োগ দেন, তাহলে আপনি বিএনপির প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। আপনি চাটুকারদের কথা বাদ দিয়ে জুলাই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন। আপনি একটা কথা বোঝার চেষ্টা করুন। তিনি বলেন, ‘আমি ৭৫ সাল থেকে জামায়াতের রাজনীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। জামায়াতের শৃঙ্খলা সশস্ত্রবাহিনীতেও নাই। জামায়াত আমীর, মামুনুল হক ও নাহিদ ইসলাম এক থাকলে সরকারের পতন অনিবার্য। তারা আন্দোলনের ডাক দিলে ঢাকা অচল করে দেবে। সরকারের পতন করে ছাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘আপনি দুর্নীতি দূর করতে পারেন নাই। আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। আপনি বিএনপির প্রধানমন্ত্রী নয়, জনগণের প্রধানমন্ত্রী হোন। এস আলম, বসুন্ধরার পাহারাদার কারা। আপনার দলের নেতাকর্মীরা তাদের রক্ষা করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আপা নাকি দেশে আসবে। এবার আসলে রক্ষা নেই। সোহরাওয়ার্দী উদযানে ফাঁসি কার্যকর করা হবে।’ সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম, সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমরি মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক আবদুল হান্নানসহ ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়