নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৬ জুলাই, ২০২৬

সেমি-কন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার খাত

প্রধানমন্ত্রী

তৈরি পোশাকশিল্পের পর সেমি-কন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাত। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনাময় পরবর্তী প্রধান এ চালিকাশক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার এরই মধ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিসহ সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর নভোথিয়েটারে দেশকে বৈশ্বিক সেমি-কন্ডাক্টর ও ডিপটেক উদ্ভাবন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল সেমি-কন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বিইএআর সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সম্মেলনকে শুধু একটি সাধারণ আয়োজন নয়, বরং আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগরদের মিলনমেলা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাদের অনেকেই নিজ উদ্যোগে এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সামিটে অংশ নিয়েছেন। বর্তমান সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যা হবে স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের এ যুগে সেমিকন্ডাক্টরকে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন ও মহাকাশের স্যাটেলাইট- প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য।

বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টরের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৬ সালের মধ্যেই গ্লোবাল সেমি-কন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে যাচ্ছে। এ বিশাল বাজারে বাংলাদেশের জন্য অপার সুযোগ বিদ্যমান এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে নির্ধারিত রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ অর্জন করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, ‘সেমি-কন্ডাক্টর শিল্পকে আমরা একটি জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত হিসেবে বিবেচনা করছি। তবে এ খাতের উন্নয়ন একক কোনো মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প মালিক, উদ্যোক্তা এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের একযোগে এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

এ খাতকে ত্বরান্বিত করতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বাজেটে সেমি-কন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর থেকে সব ধরনের কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি সেমি-কন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকারের উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন নতুন উদ্ভাবন বাস্তবায়নে সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ অনুদান’ বরাদ্দ রেখেছে, যার বণ্টন প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগ টানতে শুল্কমুক্ত (বন্ডেড) সুবিধা প্রদান এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। বিদ্যমান হাইটেক পার্কগুলোকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি নতুন বায়োটেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের কঠিন প্রতিযোগিতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা রয়েছে। আমাদের মেধা, দক্ষ তারুণ্য এবং উদ্ভাবনী শক্তির ওপর ভর করেই আমরা এ লক্ষ্য অর্জন করব। সরকার আপনাদের স্বপ্ন ও অদম্য ইচ্ছাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পাশে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, এ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন অংশীদারত্ব, গবেষণা উদ্যোগ এবং বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী ‘ন্যাশনাল সেমি-কন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিইএআর সামিট-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে তিনি সামিটে যোগ দিতে আসা দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, আইসিটি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এছাড়া বক্তব্য দেন সেমি-কন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) সভাপতি এম এ জাব্বার, বিশেষ বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, কি-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন পারড্যু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সিলিকন রিভার ইনিশিয়েটিভের চিফ আর্কিটেক্ট প্রফেসর মুহাম্মদ মোস্তফা হুসাইন। বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমি-কন্ডাক্টর ভবিষ্যৎ নির্মাণ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং সিলিকন রিভার বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশীদারত্বে দুদিনব্যাপী এ সামিটের আয়োজন করা হয়।

সামিটের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বিইএআর ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬। এতে ৩৫টি স্টলে শিক্ষার্থী ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে সেমি-কন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি, ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেম এবং অন্যান্য ডিপটেক খাতের উদ্ভাবন প্রদর্শিত হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব স্টল ঘুরে দেখেন। ২৬ জুলাই সামিটের দ্বিতীয় ও সমাপনী অনুষ্ঠানে আয়োজিত হবে ক্রিস্টে ফেলো রিসার্চ সিম্পোজিয়াম। এতে দেশের উদীয়মান সেমি-কন্ডাক্টর গবেষকরা তাদের গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করবেন। পাশাপাশি আটটি কৌশলগত জাতীয় দলিল প্রকাশ করা হবে। এর মধ্যে থাকবে সেমি-কন্ডাক্টর সুপারিশমালা, ট্যালেন্ট রোডম্যাপ ২০৩০, ইকোসিস্টেম রোডম্যাপ, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব কাঠামো, ডিপটেক অগ্রাধিকার খাত ও বাণিজ্যিকীকরণ কাঠামো।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়