সালাহ উদ্দিন বাবর
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শঙ্কাজনক
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের লড়াইয়ে বেড়েছে খুনোখুনি

দেশে প্রতিদিনই ঘটছে একাধিক খুনের ঘটনা। রাজনৈতিক কোন্দল, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে দেশজুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং ও বন্দুক হামলার ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। একের পর এক প্রকাশ্য গুলির ঘটনায় জনমনে তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ সস্ত্রাসীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বাড়ার মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে এসে ঠেকেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হচ্ছে, ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, মোট ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই অর্থাৎ মার্চ মাসে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮ ও মে মাসে ৩১০টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই তিন মাসে ৯৯৩টি মামলা হয়েছিল, তবে এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের। ফলে তুলনামূলক প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল ৭৬৭। অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৯৪। চলতি বছর এ তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শীর্ষে ঢাকা, যেখানে ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
দিন-দুপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সাধারণ নাগরিকরা নিরাপত্তা শঙ্কায়। সর্বশেষ রাজধানীর আদাবরে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা চাপাতির আঘাতে জখম হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার আদাবরের ডেল্টা গার্মেন্টের পেছনে ছিনতাইকারীদের আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালালে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ছিনতাইকারীর চাপাতির আঘাতে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ আহত হন। পুলিশের পাল্টা গুলিতে এক ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে চারজনকে আটক করা হয়।
গত শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাতজন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ করে গুলি চালায় এবং ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। গত ৮ জুন মালিবাগ-মৌচাক এলাকার আনারকলি মার্কেটের পার্কিং স্থানে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার হত্যাকাণ্ডকে তাৎক্ষণিক তর্কবিতর্ক বা ক্ষণিকের উত্তেজনার ফল বলে মনে করছে না পুলিশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মার্কেটকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার, প্রভাব-প্রতিপত্তি, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ-অসন্তোষ এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ঘটনায় যাদের নাম আলোচনায় এসেছে, তাদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আধিপত্যের পাশাপাশি সাংগঠনিক পদপদবি ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতাও বিরোধকে তীব্র করেছে। ফলে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু রাউজানেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি মৃত্যুই রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিহতদের অধিকাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। যদিও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেনি। অন্য জেলাগুলোর মধ্যে গত শুক্রবার খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া রবিবার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন। একইদিন ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে দেশজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে তা অপরাধ দমনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, একই দল এবং একই নেতৃত্বের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও সংঘাতের পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ সুবিধা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাই বেশি ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ করে নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী কারাগার থেকে জামিনে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসায় সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এ অপরাধীরা তাদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার ও পুরোনো শত্রুতার জের মেটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
মুক্ত বা ফিরে আসা শীর্ষ অপরাধীদের মধ্যে অন্যতম ‘কিলার আব্বাস’, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে ‘পিচ্চি হেলাল’, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম ওরফে ‘টিটন’, খোরশেদ আলম ওরফে ‘ফ্রিডম রাসু’, মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগর। ২০০১ সালের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা হাজারীবাগের ইমন ও মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলালের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল নিউ মার্কেটের কাছে ইমনের ভগ্নিপতি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পরিবার এ হত্যার জন্য হেলালকে দায়ী করলেও হেলাল পাল্টা অভিযোগ করেন, এর পেছনে ইমনের সহযোগীরাই জড়িত। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এছাড়া গত ১০ নভেম্বর ঢাকার আদালত পাড়ার কাছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গোয়েন্দাদের ধারণা, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ইমনের সঙ্গে বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে স্বার্থের সংঘাত, আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতার রূপ নিচ্ছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরো বাড়তে পারে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যানুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত (১১ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। এপ্রিল মাসে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত (৩৭ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। মার্চ মাসে ১১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৯১২ জন আহত (১৫ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনার বড় অংশেই বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত ছিলেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাউজানে গত ২৬ এপ্রিল বিএনপি কর্মী নাসির উদ্দিন নিহত হন। এর দুদিন আগে ২৪ এপ্রিল নিহত হন বিএনপি নেতা কাউসারুজ্জামান। ২ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। খুলনায় ৫ মার্চ সাবেক রূপসা শ্রমিক দল সভাপতি মাসুম বিল্লাহ গুলিতে নিহত হন। আর ১৪ মার্চ বাগেরহাটে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সোহেলকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ঘটনার কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। একটি হত্যাকাণ্ডের পর নানা ধরনের অভিযোগ ও দাবি উঠতে পারে। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে অনেক সময় দেখা যায়, ঘটনাটি রাজনৈতিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো দ্বন্দ্বের ফল নয়; বরং ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরেই সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর দেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে।
"








































