প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ০৪ আগস্ট, ২০২২

অবৈধ ড্রেজিংয়ে বালু উত্তোলনের উৎসব

* অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি * ভাঙনের ঝুঁকিতে বিস্তীর্ণ এলাকা * খননে নিয়ম মানার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে, রাজবাড়ীর মরা পদ্মায় এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশে সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে বাড়ছে নদীভাঙন। ঘরবাড়ি, বাঁধ ও ফসলি জমি বিলীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রশাসন এক জায়গায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করেছে।

অবৈধভাবে ড্রেজিংয়ের ব্যাপারে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (হাইড্রোলিক রিসার্চ) পিন্টু কানুনগোয় বলছেন, নদীর নাব্যতার জন্য খনন দরকার। কিন্তু খননের একটি পদ্ধতি রয়েছে। নদীর কোথায় কতটুকু গভীরতা, প্রবাহের গতিপথ কোনো দিকে, পানির ধারণক্ষমতা কেমন এসব বিবেচনা করে কোন জায়গায় কতটুকু খনন করতে হবে সেটা নির্ধারণ করে খনন করতে হয়, সেটা বিবেচনা না করে যদি খনন করা হলে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হবে। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে ড্রেজিং করার পরামর্শ তাদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তারা এ ব্যাপারে সহায়তা করেন বলেও জানান তিনি। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ক্যানাল ঘাট এলাকার ওমর আলী মোল্লা পাড়ায় ও গফুর মন্ডল পাড়ার সামনে থেকে মাল্লাপট্টি ব্রিজ পর্যন্ত মরা পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে অবাধে মাটি ও বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এতে নদীর দুপাশে থাকা দুটি গ্রামের কয়েক শত পরিবারও রাস্তাঘাট, স্কুল-মসজিদসহ ফসলি জমি ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে।

জানা গেছে, দৌলতদিয়া ক্যানাল ঘাট এলাকায় ওমর আলী মোল্লার পাড়া ও ইদ্রিস পাড়ার মাঝে মরা পদ্মা নদীতে তিন মাস ধরে অবাধে বাংলা ড্রেজিং মেশিন দিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলন করছেন কাদের ফকির নামে এক ব্যক্তি। অন্যদিকে দেব গ্রাম আতরের বাজারে পাশে মরা পদ্মায় বাংলা ড্রেজিং মেশিন দিয়ে অবাধে মাটি ও বালু তুলে বিক্রি করছেন মিনু নামে আরেকজন এবং ক্যানাল ঘাট এলাকা গফুর মন্ডল পাড়ায় দুই মাস ধরে দুটি বাংলা ড্রেজিং মেশিন দিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলন করছেন লোকমান ও আবজাল। এলাকাবাসীর নিষেধ করলে উল্টে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। মরা পদ্মার পাড়ে বসবাসকারী মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এই ড্রেজিং মেশিন দিয়ে মাটি কাটায় নদী বহু ডিপ হয়েছে। এই ড্রেজিং মেশিনটি চলছে তিন মাস ধরে বর্ষার সময় যদি নদীতে স্রোত শুরু হলে প্রথমেই আমার বাড়িটি ধসে পড়বে। পরে নদীর স্রোতের এক টানে পুরো গ্রাম শেষ হয়ে যাবে। কাদের ফকির দেশের ক্ষতি করছে।

মাটিখেকো কাদের ফকির বলেন, আমি তিন মাস ধরে ড্রেজিং মেশিন চালাচ্ছি। উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো অনুমতি আনা হয়নি। এটা চেয়ারম্যান জানেন। রাস্তার কাজ করছি।

গোয়ালন্দ উপজেলা সহকারী (ভূমি) মো. আশরাফুল রহমান বলেন, মরা পদ্মার ড্রেজিংয়ের ব্যাপারে বলতে পারেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক্সচেঞ্জ। তারাই ভালো বলতে পারবেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অংকুর বলেন, আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলাপ করে মোবাইল কোর্ট করতে হবে।

ইসলামপুর (জামালপুর) : জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলা নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের উলিয়া বাজার থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে একটি বালু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এলাকাবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের উলিয়ায় রাতের আঁধারে যমুনা নদী থেকে বলগেট মেশিনে বালু উত্তোলন করে আসছে রুহুল আমিন, কোরবান, আতিক ও দুলাল গং।

এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের উলিয়া বাজার, কড়ির তাইড়, রাজনগর, রামভদ্রা নতুনপাড়ার এলাকা। সেখানে এ এম উচ্চবিদ্যালয়, উলিয়া বাজার নূরানী হাফিজিয়া মাদরাসা ও ২০০৩ সালে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উলিয়া বাজার রক্ষা বাঁধ ভাঙনের মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উলিয়া, কড়ির তাইড়, রাজনগর, রামভদ্রা নতুন পাড়া যমুনা তীরবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিনে বলগেট দিয়ে বালু উত্তোলন করে নিচ্ছে একদল বালু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

এ ব্যাপারে একজন ভোক্তভোগী এদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মু. তানভীর হাসান রুমান বলেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন।

ধুনট (বগুড়া) : বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকালে নৌকাসহ ৪ বালু শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২ আগস্ট) রাতে ধুনট উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান চালায়। এ ঘটনায় বুধবার সকালে গ্রেপ্তার ৪ জনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রেকর্ড হয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন ধুনট উপজেলার শহড়াবাড়ী গ্রামের শুকুর আলী ব্যাপারীর ছেলে আবদুর রাজ্জাক (৩৫) ও বাচ্চু মিয়ার ছেলে ওয়াসিম (২২), সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার সানবান্ধা গ্রামের আবদুর রউফের ছেলে আনিছুর রহমান তাবু (৩৮) ও ফারুক হোসেন (৪০)। বুধবার দুপুরে ধুনট থানা থেকে তাদের আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার মহন্ত জানান, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সংবাদ পেয়ে থানা পুলিশের সহযোগিতায় সেখানে অভিযান চালিয়ে ৪ ব্যক্তিকে আটক এবং বালু তোলার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।

চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) : অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে সাঙ্গু নদীর পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের বসানো সিসি ব্লকে ধস দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে উপজেলার সাঙ্গু নদের তীর সংলগ্ন বৈলতলী, বরমা ও দোহাজারী এলাকার সিসি ব্লকগুলো ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

চলতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের চাপে ব্লক বিলীন হলে, খালের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে লোকালয় পরিণত হতে পারে গভীর নদীতে। নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে মানুষের ফসলি জমি ও বাড়িঘর। এমনটি বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেম ও নুরুদ্দীন।

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী অপু দেব জানান, ‘নদীর যেসব স্থানে সিসি ব্লক ধসে যাচ্ছে তা সংস্কার ও নতুন স্থানে ব্লক বসানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close