গাজী শাহনেওয়াজ

  ২১ জুন, ২০২১

কঠোর নিরাপত্তায় ২০৪ ইউপিতে ভোট আজ

কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আজ সোমবার দেশের ২০৪ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হতে যাচ্ছে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনে উপনির্বাচন এবং দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনও আজ। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। এ নির্বাচন হবে ব্যালট এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) উভয় পদ্ধতিতে; যার মধ্যে ২০টিতে ইভিএম এবং বাকি ১৮৪টিতে ব্যালটে।

শান্তিপূর্ণভাবে এসব নির্বাচন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কেন্দ্রওয়ারি নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রাণসংহারি কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি মানায় জিরো টলারেন্সনীতি গ্রহণ করেছে কমিশন। মাস্ক ছাড়া একজন ভোটারও কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ইসি থেকে। এর জন্য কেন্দ্রে থাকবে কোভিড প্রতিরোধে সুরক্ষাসামগ্রী। ইসির কর্মকর্তারা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

------
এটি সারা দেশের সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউপির মধ্যে প্রথম ধাপের নির্বাচন। কোভিড পরিস্থিতির কারণে খুলনা বিভাগের সব নির্বাচনসহ ১৬৩ ইউপির ভোট স্থগিত হয়। এ ছাড়া ৭টি পৌরসভায় ভোট স্থগিত হয়। আর দ্বিতীয় ধাপের তফসিলও দিতে পারেনি একই কারণে। গত ১১ এপ্রিল এসব ইউপিতে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।

এদিকে, প্রথম ধাপের নির্বাচন ঘিরে সহিংস ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে নির্বাচনী এলাকায়। গতকাল রবিবারও অনেক প্রার্থী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেছেন। বরিশাল সদরের ৬নং জাগুয়া ইউনিয়নের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান প্রার্থী হেদায়েতুল্লাহ খান আজাদী সব কেন্দ্রে একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগে জানান, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যাংক ডাকাতির মতো ভোট ডাকাতি হতে পারে এমন আশঙ্কা করে ইসিকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

এ ছাড়া অন্তত অর্ধশতাধিক ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে বরিশাল, পিরোজপুর, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, নরসিংদী ও মাদারীপুর জেলার ইউপিগুলোতে বেশি সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে শনিবার হামলা-পাল্টাহামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ এলাকায় স্থানীয় এমপি সমর্থক ও বিরোধী প্রার্থী-কর্মীদের মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ নিয়ে কমিশনে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টির মতো অভিযোগ এলেও সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত করেনি ইসি। ইসির বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নির্বাচনে সহিংসতার জন্য স্থানীয় প্রশাসন যেসব ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন সেখানে অতিরিক্ত বডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের দিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে আমরা একটি ইউনিয়নে তিন প্লাটুন বিজিবি দিয়ে থাকি কিন্তু সহিংসতার কারণে ৭ প্লাটুন বিজিবি দিয়েছি। এটা আমাদের বাড়তি প্রস্তুতি। এ ছাড়া প্রতিবার একটি কেন্দ্রে দুজন পুলিশ থাকে এবার সেখানে দ্বিগুণ দিয়েছি অর্থাৎ ৪ জন পুলিশসহ আনসার নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ভোটের দিন আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। আমরা ফেয়ার নির্বাচন করার নির্দেশনা দিয়েছি। আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট হবে সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক ভোটারকে মাস্ক পরে আসতে হবে। এবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্বাচন হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি প্রার্থী না দেওয়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে। বিদ্রোহী প্রার্থীরাও পদধারী হওয়ায় কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। এছাড়া তৃণমূলের এ নির্বাচনে মেম্বার (সদস্য) ও নারী মেম্বার প্রার্থীরাও সক্রিয়। এসব কারণেই মূলত সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, শুক্র, শনি ও রবিবার ভোলার চরফ্যাশন ও বোরহানউদ্দিন উপজেলা, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ও পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ভোট ঘিরে উত্তেজনা ও শঙ্কা আছে থাকবে। তবে তা সীমালঙ্ঘন যাতে না ঘটে সেজন্য পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসির তথ্য মতে, মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে বরিশাল অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সহিংসতার আশঙ্কা বেশি। এ বিভাগের ৬ জেলার ৩০টি উপজেলার ১৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে। যদিও ২৬টিতে চেয়ারম্যানরা একক প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছেন। বরিশাল জেলার ৯টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে হিজলা, মুলাদী, বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল সদর ও বাবুগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করছেন। এসব এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

আরো জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়া, চরবাড়িয়া ও কাশিপুর, উজিরপুর উপজেলার জল্লা ও সাতলা, বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠি, দাড়িয়াল, কবাই ও গাড়োরিয়া, হিজলা উপজেলার হরিনাথপুর, মেমানিয়া, বড়জালিয়া, মুলাদী উপজেলার সফিপুর, বাবুগঞ্জ উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ও বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আমখোলা, দুমকীর মুরাদিয়া, বাউফলের কাচিপাড়া, কেশবপুর, আদাবাড়িয়া ও চন্দ্রদ্বীপ ইউপিতে। এছাড়া রয়েছে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সমুদয়কাঠি ইউনিয়ন এবং মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী আমড়াগাছিয়া, বেতমোড় ও শাপলেজা। বরগুনার সদর উপজেলার বদরখালী, বুড়িরচর, আয়ালা পাতাকাটা, নলটোনা ও বদরখালী, বেতাগী উপজেলার বেতাগী ও কাজীরহাট, আমতলী উপজেলার আঠারোগাছিয়া এবং বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ও ডৌয়াতলা। ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ও চাচড়া। ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার গাবখানধানসিঁড়ি, গাভারামচন্দ্রপুর ও কীত্তিপাশা, নলছিঠি উপজেলার মোল্লারহাট ও দপদপিয়া, কাঁঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ও আওরাবুনিয়া এবং রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চররমিজ ও কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউপিতে সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইসির যুগ্ম সচিব আসাদুজ্জামান প্রতিদিনেরে সংবাদকে বলেন, প্রথম ধাপে ১৩টি জেলার ৪১টি উপজেলায় ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১ হাজার ৮৩৬টি এবং ভোটকক্ষ রয়েছে ১০ হাজার ২৬০টি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং হিসেবে কাজ করবেন। নির্বাচনে মোবাইল পুলিশ ২০৪ জন, স্ট্রাইকিং পুলিশ ৭৪ জন, র‌্যাবের টিম ১২৪টি, বিজিবি ১২৩ প্লাটুনসহ ৫০৮৮টি ফোর্স মোতায়েন থাকবে। অন্যদিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৩৯৩ জন এবং ৪১ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন। প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের সংখ্যা ১২ হাজার ২০৭ জন এবং পোলিং অফিসারের সংখ্যা ২০ হাজার ৫২০ জন।

চেয়ারম্যান প্রার্থী ৮৫৯ জন, সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার প্রার্থী ২১৫৪ জন এবং সাধারণ মেম্বার প্রার্থী ৬৯৬০ জন। বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২৮ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close