ব্রেকিং নিউজ

আলু মেলেনি নতুন দামেও বাজারে নেই তদারকি

* দুষ্টচক্রের কারসাজি দেখছেন বিশ্লেষকরা * ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে * কৃষিমন্ত্রী বললেন দু-এক দিনের মধ্যেই জোরদার হবে মনিটরিং

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

হাসান ইমন

আলুর দাম দ্বিতীয় দফায় কেজিতে ৫ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে ৩৫ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হলেও ওই দামে এখনো বিক্রি শুরু হয়নি। গতকাল বুধবারও রাজধানীর কারওয়ানবাজার, মহাখালী, রামপুরাসহ বিভিন্ন বাজারে খুচরায় ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে আলু। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির দৈনিক বাজার দরেও দেখা গেছে কেজিপ্রতি ৪২ থেকে ৪৫ টাকা। সরকার দর পুনর্নির্ধারণ করার পরও ওই দামে আলু না পাওয়াকে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার দর পুনর্নির্ধারণ করলেও কোল্ডস্টোরেজ থেকে আমরা ওই দামে কিনতে পারিনি। নতুন দামে আড়তে আলু আসতে আরো দুই দিন সময় লাগতে পারে।

এদিকে পেঁয়াজও গত সপ্তাহের মতো বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। গতকাল পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজ ৮০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। তবে পাকিস্তান ও মিসর থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর চালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যও বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে।

গত মঙ্গলবার কৃষি বিপণন অধিদফতরে আলুর দাম স্থিতিশীল রাখতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে সবার ঐকমত্যে আলুর নতুন দর নির্ধারণ করা হয়। নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি কেজি আলু হিমাগার পর্যায়ে ২৭ টাকা, পাইকারিতে ৩০ এবং খুচরায় ৩৫ টাকায় বেচাকেনা হবে। এর আগে গত ৭ অক্টোবর কৃষি বিপণন অধিদফতর প্রতি কেজি আলুর দর নির্ধারণ করেছিল হিমাগারে ২৩, পাইকারিতে ২৫ এবং খুচরায় ৩০ টাকা। তখন এই দামের বিষয়ে আপত্তি জানান ব্যবসায়ীরা। এবার সবার সঙ্গে আলোচনায় ওই দরের চেয়ে কেজিতে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হলো।

গতকাল রাজধানীর রামপুরা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখে যায়, বেশির ভাগ দোকানে আলুর সরবরাহ কম। এই বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৪৫ টাকায়। ইউনুস মিয়া নামের এক দোকানি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বাজারে আলুর সরবরাহ কম। ৪৩ টাকা দরে আলু কিনেছি। তাই ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার দর বেঁধে দিলেও আমরা ওই দামে কিনতে পারিনি। পাইকারি ব্যবসায়ীরা আগের দামে বিক্রি করছে। আমাদের কেনা বেশি, তাই বেচাও বেশি। তার ওপর ঘাটতি আছে, যাতায়াত খরচ আছে।

তবে আড়তদাররা বলেছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে তারা এখনো আলু পাননি। আগে বেশি দামে কেনা আলু বিক্রি করতে হচ্ছে বেশি দামে। তবে দু-চার দিনের মধ্যে সরকার নির্ধারিত দামে আলু পেলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হবে বলেও মনে করেন তারা।

এ ব্যাপারে কাওয়ানবাজারে বিসমিল্লাহ বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী আফজাল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, গত চার দিন ধরে আমার আড়তে আলু নেই। সরকার যে দাম ঘোষণা করেছে, সেই দামে আলু আনার জন্য যোগাযোগ করছি। যদি পাই তাহলে সেই দামেই বিক্রি করব।

কারওয়ানবাজারের আরেক আড়তদার সাইফুল ইসলাম বলেন, আজকে (বুধবার) আড়তে আলু কম ছিল এবং যে আলু ছিল তা আগের, বেশি দামে কেনা। এজন্য সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা যায়নি। তারপরও কমিয়ে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। তিনি আরো বলেন, সরকার যে দর দিয়েছে, সে দর অনুযায়ী স্টোরেজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আলু স্টোরেজ থেকে আসতে আরো দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে। সব মিলিয়ে আলুর দাম কমতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে।

তবে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজার তালিকায় দেখা যায়, আলু ৪৩ থেকে ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।

এসব সত্ত্বেও গতকাল দুপুর পর্যন্ত কারওয়ানবাজারে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের বা সরকারি অন্য কোনো সংস্থাকে বাজার তদারকি করতে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বাজারে আলু সংকট তৈরি করছে ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে আলুর কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। অথচ বর্তমানে আলুর কোনো ঘাটতি নেই। তিনি আরো বলেন, যারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এছাড়া বাজার মনিটরিং আরো জোরদার করতে হবে। তা না হলে এই দুষ্টচক্রটি দাম কমাবে না।

এ বিষয়ে গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, নির্ধারিত ৩৫ টাকা দরে আলু বিক্রি হচ্ছে কিনা, দু-একদিনের মধ্যেই বাজার মনিটরিং আরো জোরদার করা হবে। তবে ব্যবসায়ীরা এই দাম নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরেছেন।

তিনি আরো বলেন, তারা নিজেরা বলেছেন এই দাম বাস্তবায়ন না করলে মুনাফাখোর হিসেবে বিবেচিত হবে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে আমাদের সহযোগিতা করতে।

এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হোক আমরা সেটা চাই না। তবে আজ (বুধবার) থেকে যে আলু বিক্রি হবে, সেটি সরকারের নির্ধারিত দামেই বিক্রি করতে হবে। সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, কেউ এর বাইরে গিয়ে ব্যবসা করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে পেঁয়াজ ও চাল বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল কারওয়ানবাজারে দেশি পেঁয়াজ পাল্লাপ্রতি (৫ কেজি) ৪০০ থেকে ৪১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যা খুচরা বাজারের বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি। আর পাকিস্তানি পেঁয়াজ পাল্লাপ্রতি ৩৫০ এবং মিসরের পেঁয়াজ ৩০০ টাকা পাল্লা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের কেজি ৫৫ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি (পায়জাম ও লতা) চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫৫ টাকায়। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নিম্নবিত্তদের খাদ্য হিসেবে পরিচিত মোটা চালের দাম। এই চালের (স্বর্ণ ও চায়না ইরি) কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা।

বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আসছে, তারপরও দাম কমছে না কেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে পাইকারি ব্যবসায়ী মো. হারুন বলেন, বিদেশ থেকে যে পরিমাণে আসার কথা, সে পরিমাণে পেঁয়াজ আসেনি। যতটুকু এসেছে, তার প্রভাব বাজারে পড়েনি। তবে দেশের নতুন পেঁয়াজ না আসা পর্যন্ত দাম কমবে না বলেও জানান তিনি।

 

 

"