উত্তরাঞ্চলে তৃতীয় দফা বন্যা

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

উত্তরাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যস্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে, দেশের ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ৬২টির, হ্রাস পেয়েছে ৩৮টির, অপরিবর্তিত রয়েছে একটির। এ ছাড়া বিপৎসীমার ওপর স্টেশনের সংখ্যা দুটি, বিপৎসীমার ওপর নদীর সংখ্যা দুটি। এদিকে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। অপরদিকে, পদ্মা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে দিনাজপুরে ১৮৬ মিলিমিটার, কুড়িগ্রাম ১৩২ মিলিমিটার, চিলমারী ১৩০ মিলিমিটার, জাফলং ১১৫ মিলিমিটার, লালাখাল ৯০ মিলিমিটার, রংপুর ৮৪ মিলিমিটার, মহেশখোলা ৫৮ মিলিমিটার, জারিয়াঞ্জাইল ৫৫ মিলিমিটার এবং নারায়ণগাঁও ৫০ মিলিমিটার। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের ২০টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘন্টায় ৪৫-৬০ কিরোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। বন্যার খবর জানাচ্ছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) : গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেখা দিয়েছে তৃতীয় দফা বন্যা। বন্যায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসন ২ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দির কথা জানালেও উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে বন্যাদুর্গত এলাকায় মানুষে দুর্ভোগ বাড়ছে। গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি নিয়ে তারা বেড়িবাঁধ, উঁচু রাস্তা কিংবা ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের চর গোরকমন্ডল, চর পেচাই, বস্তী গোরকমন্ডল, ঝাউকুটি, পশ্চিম ফুলমতি, কিশামত শিমুলবাড়ী, যতিন্দ্র নারায়ন, সোনাইকাজি, রোশন শিমুলবাড়ী, কবিরমামুদ, প্রাণকৃঞ্চ, জোৎকৃঞ্চকরি, চর বড়লই, বাংলাবাজার, বড়ভিটা, চর ধনিরাম, ধনিরাম, খোচাবাড়ী, চর খোচাবাড়ী, রাঙ্গামাটি, ভাঙ্গামোর এলাকাসহ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বড়ভিটার পাশে সারোডোব এলাকায় প্রবল পানির স্রোতে ধরলার বেড়িবাঁধ ভেঙে হুহু করে কাদা মিশ্রিত বন্যার পানি প্রবেশ করছে। ওই এলাকার রোপা আমনখেত ৭০০ হেক্টর, সবজি ৫০ হেক্টর, মাশকলাই ২০ হেক্টর ও কলাসহ ৩০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রশিদ।

কুড়িগ্রাম রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার দিন আরো ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, সার্বক্ষণিক উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বানভাসিদের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। আপাতত পানিবন্দিদের জন্য জিআরের কোনো বরাদ্দ নেই।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ছে, সেইসঙ্গে বাড়ছে ভাঙন। নদ-নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। ধরলার পানি কুড়িগ্রাম অংশে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার সদর ও ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকেছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, আগামী দুই থেকে তিন দিন জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় জেলার নদ-নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করবে।

পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে গত বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৫ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

কুড়িগ্রাম রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বুধবার দুপুর থেকে জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী আরো চার দিন বজ্রসহ মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তিস্তার ভাঙনে রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে শতাধিক পরিবার এবং ধরলার ভাঙনে সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ও ভোগডাঙা ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুহারা জীবনযাপন করছে। নাগেশ্বরী উপজেলায় দুধকুমার নদের ভাঙনে ভিটে হারাচ্ছেন নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা।

 

 

"