জন্মদিন
নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি
অলাত এহ্সান

জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যে সংকটে পতিত হলো তা হচ্ছে, তার সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব। পৃথিবীতে যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা থেকেই মানুষ ঔপনিবেশিকতার মুখোমুখি হতে শুরু করে নতুন ও প্রবলভাবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যে ইতিহাসের সন্নিবেশ ঘটে। সেলিনা হোসেন যে আলো ফেলে এই সম্পর্ক দেখতে ও দেখাতে চান, তা হলো সময় তথা ইতিহাস। এ কারণে ইতিহাস তার সাহিত্যে মানবিক সম্পর্কের সঙ্গে নানান ভাবে এসেছে। রাষ্ট্র বিভাজনের সূচনায় বাঙালি জাতির স্বাতন্ত্রিক রাষ্ট্রের উৎসের যে ইতিহাস, সেই ’৪৭, ’৫২, ’৭১ ঘুরেফিরে এসেছে তার সাহিত্যে। এদিকে দিয়ে বিবেচনা করলেও সেলিনা হোসেনের সাহিত্য উৎস ইতিহাস থেকেই উৎসারিত।
আজ ১৪ জুন ৭০ বছরে পা দিলেন তিনি। এই অতিক্রান্ত ঊনসত্তর বছরের মধ্যে ৫২ বছর ধরেই তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। এই দীর্ঘ সময় ধরে তার লেখার সংখ্যা অনেক। বিষয় বৈচিত্র্যেও তা অনন্য। মূলত বাংলা সাহিত্যে এখন অবধি যে ক’জন লেখক বিপুল সমৃদ্ধিতে টিকে আছেন, তার মধ্য সেলিনা হোসেন একজন। লেখিকার ভাষায়, ‘আমার এক হাতে লেখালেখি আরেক হাতে আমার সমস্ত জীবন।’
সেলিনা হোসেন লেখনীর মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যে তার স্থান পাকাপাকি করে নিয়েছেন। তিনি একজন কথা-সাহিত্যিক, লেখক ও ঔপন্যাসিক। সংগ্রামী আলেখ্য তার উপন্যাসের মৌলিক উপাদান। তার সৃষ্ট অধিকাংশ চরিত্রই সংগ্রামী ও সংবেদনশীল। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও আন্দোলন তার ঔপন্যাসিক সত্তাকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছে। তার উপন্যাসে রয়েছে একদিকে শ্রেণি সংগ্রামের উদ্দীপনা অপরদিকে শোষণ মুক্ত সমাজের স্বপ্ন। যদিও আজকের দিনের লেখালেখি নিয়ে ভিন্নকথা বলার সুযোগ আছে বৈকি।
এসবের একটা সূত্র সেলিনা হোসেনের জন্ম ও লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠার মধ্যেই পাওয়া যাবে। সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন। তার পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রামে। তার জন্ম সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে। তার জন্মের দুই বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের ৬ ও ৯ তারিখে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পৃথিবীতে প্রথম আণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তাৎক্ষণিকভাবেই প্রায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষ মারা যায় তাতে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বেজুড়ে অনেক দেশেই তখন হতাহতের শিকার হয় অসংখ্য মানুষই। ভারতবর্ষ পরমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ভয়াবহতার সারাসরি শিকার না হলেও পতিত হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে। ইতিহাসে বঙ্গাব্দ ১৩৫০ অনুসারে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ খ্যাত (খ্রিস্টীয় ১৯৪৩) মন্বন্তর এই ভারতবর্ষেই ঘটে লেখিকার জন্মের চার বছর আগে। তাতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিক নিহতের তুলনায় ২০ গুণ বেশি মানুষ মারা যায়। এই রেশ সেলিনা হোসেন অনুভব করেন জন্মের পর পরই। সবচেয়ে বড় যে দিক, তার জন্মের তিন মাসের মধ্যেই ভারতবর্ষ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায়। আবার ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঘটনা ঘটে তার জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যেই। আরো একটি দিক হলো, তার যে জন্মস্থান, রাজশাহী, তখন তেভাগা আন্দোলনের জন্য উত্তাল ছিল। একজন ভবিষ্যৎ সংবেদনশীল লেখক হিসেবে সেলিনা হোসেন যে এই সব ঘটনার আঁচ গায়ে মেখে বেড়ে উঠবেন তা খুবই স্বাভাবিক ছিল।
সেলিনা হোসেনের লেখালেখি শুরু সেই স্কুলবেলাতেই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকা-ে নিবিড়ভাবে যুক্ত হন। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি সমাজ দর্শন হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করেন। পড়াশোনা, জীবন দেখা ও বোঝার দিকে তার সত্যতা যাচাই করেছেন এই নিরিখেই। লেখনীর মাধ্যমে তার বিস্তার ও দিক অন্বেষণ করেছেন।
আমাদের মনে রাখতে হয়, মোটা দাগে উল্লেখ করলেও, ’৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৫ এবং ’৬৯ সময় পর্ব তিনি খানিক বোঝাপড়ার মধ্যেই অতিক্রম করছেন এবং শিক্ষার্থী জীবনে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। আবার, ’৬৯ সালেই পাকিস্তানিদের হাতে খুন হওয়া বুদ্ধিজীবী শামসুজ্জোহা তার বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক ছিলেন। সুতরাং এই সব কালপর্ব ও ঐতিহাসিক ঘটনা মনে রাখলে বলা যায়, সেলিনা হোসেনের কোনো সুযোগই ছিল না, ইতিহাস থেকে বিচ্যুত হওয়ার। বরং এও বলা যায়, সেলিনা হোসেন তার প্রজ্ঞা ও মননের মাধ্যমে তার সময় ও ইতিহাসের প্রতি যথার্থই সাড়া দিয়েছেন।
প্রথম জীবনে তিনি কবিতা দিয়েই সাহিত্য চর্চা শুরু করেছিলেন। ষাট দশকের মধ্যভাগে তিনি গল্প লেখা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় গল্পগন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’। অর্থাৎ স্বাধীনতাপূর্ব এক সান্ধ্য ও নিয়ন্ত্রিত সময়ে একজন ‘নারী’ সাহিত্য মাধ্যমে সক্রিয় থাকছেন, গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করছেনÑএটা সত্যিই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সে বছর প্রবন্ধের জন্য তিনি ডক্টর এনামুল হক স্বর্ণপদক পান।
তার প্রথম গল্পগ্রন্থের নামের ভেতর যে দ্যোতনা ছিল, তা পরবর্তী সময়ের লেখা দিয়ে বহুদূর তাড়িয়ে এনেছেন। তিনি এখনো বাঙালির যে উৎস তা নানাভাবে উন্মোচন করে যাচ্ছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে তার বিপুল ও সমৃদ্ধ লেখনী দিয়ে সাহিত্যকেই পুষ্ট করেছেন। ইতোমধ্যে তার ৩১টি উপন্যাস, ১১টি গল্পগ্রন্থ এবং ৯টি প্রবন্ধের গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। এছাড়াও তার ৩০টি শিশুতোষ গ্রন্থ আছে। তিনি নারী অধিকার বিষয়ক বেশ কিছু প্রামাণিক ও গবেষণা গ্রন্থও রচনা এবং সম্পাদনা করেছেন। যা তার সমাজ মনস্কতা ও বৈচিত্র্যকেই নির্দেশ করে।
‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ সেলিনা হোসেনের একমাত্র ট্রিওলজি (উপন্যাস ত্রয়ী)। ১৯৯৪ সাল থেকে যথাক্রমে এর খ-গুলো প্রকাশ হয়। এতে তিনি ’৪৭ থেকে ’৭৫ কালপর্বের সবগুলো রাজনৈতিক ঘটনার অভিঘাত চিত্রিত করতে চেয়েছেন। উপন্যাসটির জন্য তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ পেয়েছিলেন। তার সাহিত্যের পরিচিতি অনেক আগেই দেশের গ-ি ছাড়িয়েছে। তার গল্প-উপন্যাস ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি, কানাড়ি, রুশ, মালে, মালয়ালাম, ফারসি, জাপানি, কোরিয়ান, উর্দু, ফিনিস (ফিনল্যান্ড), আরবিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়।
সাহিত্যে তার অনন্য কৃতিত্বের জন্য দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে আছেÑবাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮০), ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), একুশে পদক (২০০৯)। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ভারত থেকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑরবীন্দ্র্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা থেকে ডিলিট উপাধি (১৯১০), রামকৃষ্ণ জয়দয়াল এওয়ার্ড, দিল্লি (২০০৮), রবীন্দ্র্র স্মৃতি পুরস্কার, কলকাতা (২০১৩), আইআইপিএম (ওওচগ) কর্তৃক আন্তর্জাতিক সুরমা চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, দিল্লি (২০১২)। দক্ষিণ এশিয়ার লেখকদের জন্য প্রবর্তিত সাহিত্য আকাদেমি, দিল্লি থেকে ২০১১ সালে তিনি প্রেমচাঁদ ফেলোশিপ লাভ করেন।
সেলিনা হোসেনের সাহিত্যের অনন্য দিক হলো ইতিহাসে মানুষের প্রভাব ও অংশগ্রহণ। যে কারণে তার সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষেপটে রচিত সাহিত্যের পরিমাণ অনেক। বলতে গেলে, বাংলাদেশ ও বাঙালির উৎস সন্ধানে তিনি নানাভাবেই ব্যাপৃত। তাছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার সাহিত্য। অর্থাৎ তার সাহিত্যের চরিত্ররা নানাভাবে পীড়িত হলেও উন্মুল হয় না। তাদের জীবনে ইতিহাস, সমাজ, সময়, সংগ্রাম সমানভাবে সক্রিয় থাকে। তাদের সংগ্রামের উৎস খুঁজে পাওয়া দেশের সংগ্রামের ইতিহাসে সঙ্গে। উৎস থেকে উৎসারিত, সতত বহমান এই সব জীবন যেন নিরন্তর ঘণ্টা ধ্বনির মতোই তাদের সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করে যাচ্ছেন। একইভাবে উৎস থেকে উৎসারিত নিরন্তর ঘণ্টা ধ্বনির মতো লেখিকা এখানো সাহিত্য রচনা করে যাচ্ছেন। আশা করা যায় ‘উৎস থেকে উৎসারিত নিরন্তর ঘণ্টা ধ্বনি’ আরো অনেক দিন, বিচিত্র দ্যোতনায় অনুরণিত হবে।
লেখক : সাংবাদিক, গল্পকার
"




































