মো. সাখাওয়াত হোসেন
দৃষ্টিপাত
অসহযোগ আন্দোলনের নামে ভোগান্তি

১০ বছর আগে ১ দিনের হরতাল-অবরোধে রাষ্ট্রের ক্ষতি হতো ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, বর্তমানে ১ দিনের হরতাল-অবরোধে ক্ষতি হয় ৬ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। সমসাময়িককালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার যেমন বেড়েছে, ঠিক তেমনি হরতাল-অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ততার পরিমাণও প্রায় ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সবাই জানি, পুরো পৃথিবী করোনা-পরবর্তী সময় থেকে একটি অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ অর্থনৈতিক সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। বাংলাদেশ করোনার ভয়াবহতাকে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে এবং দেশবাসীকে করোনার টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করে বিশেষ দৃষ্টি কেড়েছে বিশ্ববাসীর। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পুরো পৃথিবীতে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধ আহ্বানের মধ্য দিয়ে মূলত অর্থনীতির চাকাকে পিষ্ট করে দিয়েছে আহ্বানকারীরা। এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা যায়, আহ্বান করা হরতালে জনগণের তেমন সম্পৃক্ততা নেই। তবে একেবারে যে হরতাল-অবরোধের নেতিবাচক প্রভাব নেই, সেটিও বলা যাবে না। দেখা যায়, কিছু কিছু সেক্টরে হরতাল-অবরোধ আহ্বান করলেই কাজে স্থবিরতা চলে আসে। তা ছাড়া মুষ্টিমেয় একটি পক্ষ যে তাদের সঙ্গে নেই সেটিও বলা যাচ্ছে না, বিচ্ছিন্ন আকারে দু-এক জায়গায় বাসে-ট্রেনে আগুন দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
বলা হচ্ছে, হরতাল-অবরোধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেয়ে বিএনপি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জনসহ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ঘোষিত কর্মসূচিতে ৭ জানুয়ারির ভোট বর্জন, ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা, সেবামূলক কর, খাজনাসহ বিভিন্ন প্রদেয় না দেওয়া, ব্যাংকে অর্থ আমানত না রাখা এবং আদালতে হাজিরা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। জানা যায়, নির্বাচনের আগে ‘গণকারফিউ’র মতো কর্মসূচি দিতে পারে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন; অসহযোগ আন্দোলন বাস্তবায়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্যের কারণে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি কী করে, জনগণকে আদৌ সম্পৃক্ত করতে পারবে কি না- এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে ১৯৭১ ও ১৯৯৬ সালে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল। যে দুটি আন্দোলনেরই নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এক আন্দোলনের ডাক দেয়, ইতিহাসে যা অসহযোগ আন্দোলন নামে পরিচিত। অহিংস পদ্ধতিতে সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করে ভারতের ব্রিটিশ শাসনকে ব্যর্থ করে দেওয়াই ছিল এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। সব অফিস ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি স্কুল, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী থেকে সরকারি চাকরি ত্যাগ করেন। আইনজীবীরা সরকারি আদালত বর্জন করেন। এ ছাড়া গণপরিবহন, ব্রিটিশ দ্রব্যসামগ্রী, বিশেষ করে কাপড় বর্জন করা হয়। তবে সেই আন্দোলনও একসময়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। যার কারণে আন্দোলন স্থগিত করতে বাধ্য হন মহাত্মা গান্ধী। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলমান থাকে।
যেহেতু বিএনপির আহ্বানে হরতাল-অবরোধে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি, সেহেতু নির্দ্বিধায় বলা যায়, অসহযোগ আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হবে দলটি। দলের মধ্যে নেতৃত্ব সংকটের কারণে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দূতিয়ালি থাকায় দলটি নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের আন্দোলনের জন্য তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ জনতাকেও বিএনপি একীভূত করতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলটি যেহেতু দলীয় কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে, সংগত কারণেই সাধারণ জনতাকেও অসহযোগ আন্দোলনের নামে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত দুষ্কর হয়ে পড়বে। তা ছাড়া বিএনপি যে বিষয়গুলোতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিএনপির সাধারণ কর্মীরাই সাদরে গ্রহণ করবে না। অন্যদের বেলায় কতটুকু কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে বোঝা যাচ্ছে, অসহযোগ আন্দোলন তেমন একটা ফল বয়ে আনবে না দলটির জন্য, তবু সাধারণ জনগণের ভোগান্তির পাল্লা ক্রমান্বয়ে ভারী হলো। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, কোন তারিখে হরতাল আহ্বান করা হচ্ছে আবার কখন হরতালের সময়সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে সাধারণ জনগণের তেমন মাথাব্যথা নেই। তথাপি দেখা যাচ্ছে, মাঝেমধ্যে অতর্কিতভাবে পাবলিক পরিবহনে সরকারি সম্পদ ধ্বংসের পাঁয়তারা হিসেবে আক্রমণের মধ্য দিয়ে হরতালের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সামনে নিয়ে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, অনেকের মধ্যে একটি ভয়, শঙ্কা ও অস্থিরতা বিরাজ করে। আহূত অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে আবার ভোগান্তিতে পর্যবসিত করেছে। মূলত যে লক্ষ্য সামনে রেখে অসহযোগ আন্দোলন আহ্বান করা হয়েছে, সেসব কখনোই আলোর মুখ দেখবে না। কেননা জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে কখনোই কোনো অসহযোগ আন্দোলন বাস্তবে কার্যকর হয়নি। বিএনপির আহূত অসহযোগ আন্দোলনও শুধু দেশবাসীর ভোগান্তির মাত্রাকে ক্ষণিক সময়ের জন্য জিঁইয়ে রাখবে।
সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আনয়নের। এমন সব রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন থেকে বিরত থাকতে হবে, যার কারণে সাধারণ জনগণ ভুক্তভোগী হয়, ক্ষতিগ্রস্ততার মুখোমুখি হতে হয়। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর বর্তমানের সংস্কৃতি একরূপ হতে পারে না। বিশ্ব পাল্টেছে, সেজন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও হতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না ঘটার কারণে বহু আগের সংস্কৃতি এখনো যারা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের জনগণ বয়কট করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। কাজেই যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নের আগে কর্মসূচিটিতে জনগণের সায় রয়েছে কি না- সেটি যাচাই করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দলের কর্মী-সমর্থকদের সমর্থন রয়েছে কি না কিংবা কর্মসূচি সম্বন্ধে দলীয় নেতাকর্মীরা সম্যক অবগত কি না- সে বিষয়েও জোর দিতে হবে। তা না হলে রাজনৈতিক দল কর্তৃক গৃহীত যেকোনো কর্মসূচি কখনোই সফলতা পাবে না। বিএনপির আহূত অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাপারে কর্মী-সমর্থকরাও অবগত নন- এ মর্মে পত্রিকার খবর পাওয়া যায়। সেজন্যই বলা যায় এবং বিশ্লেষকরাও মনে করেন, আহূত অসহযোগ আন্দোলনও তেমন কাজে আসবে না দলটির জন্য। উল্টো কর্মসূচি প্রদান করে সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি আতঙ্কের সৃষ্টি করা হলো।
এসব আন্দোলনের ডাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা। পরিবহন খরচ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, কেননা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় পরিবহন বের করতে হয় এবং শ্রমিক, সুপারভাইজর ও ড্রাইভারদেরও ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায়, দিন মজুরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিকদের কাজের জোগানও কমে আসে। সংগত কারণেই সাধারণ মানুষদের জীবনে অস্থিরতা চলে আসে এবং অর্থনীতিতে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও স্থবিরতা নেমে আসে। সুতরাং সার্বিক দিক বিবেচনায় উল্লেখ করা যায়, বিএনপি আহূত অসহযোগ আন্দোলনে তাদের লক্ষ্য কোনোভাবেই পূর্ণ হবে না বরং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির নামে আন্দোলনের একটি কৌশল সামনে নিয়ে এসেছে। সবশেষ বলা যায়, সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আবির্ভাব ঘটায় এমন কর্মসূচিতে
কখনোই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সম্ভব নয় এবং জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া প্রত্যেকটি রাজনৈতিক আন্দোলনই ব্যর্থতায় উপনীত হয়।
লেখক : চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
"




































