নাহিদ হাসান
মতামত
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল কি আগামী বিশ্বের যুদ্ধক্ষেত্র!

১৯১২ সালে চীনের সর্বশেষ রাজবংশ চীন রাজবংশের পতন ঘটে ও চীন প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়। যেটি ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত চীনের মূল ভূখণ্ড শাসন করে। ১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধে সাম্যবাদী জনগণের মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রজাতন্ত্র পরাজয় বরণ করে। যার ফলে চীনের সাম্যবাদী দল ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর বেইজিংয়ে (পিকিং) গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে চীন প্রজাতন্ত্র সরকার তাইওয়ান দ্বীপে পালিয়ে যায় ও তাইপে সাময়িক রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে। চীনে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হওয়ার ফলে তা আমেরিকার গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থি হয়। এ কারণে চীন দীর্ঘ সময় জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করতে পারেনি, চীনকে নেতৃত্ব দিয়েছে বর্তমান তাইওয়ান। তবে সীমান্ত নিয়ে ১৯৬৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের সাত মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলে উভয়ের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। আমেরিকা এ সুযোগে বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীনকে নিজের দিকে টানে ও চীনের সুবিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক উন্নতির দিকে যায়। এদিকে ১৯৭১ সালে চীন জাতিসংঘের সদস্য পদ ও ভেটো প্রদানের ক্ষমতা লাভ করে। অন্যদিকে ১৯৭৭ সালে অর্থনীতিতে মুক্তবাজার সংস্করণ করে বিপুল জনগণকে কাজে লাগিয়ে চীন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে অন্যরকম অর্থনৈতিক শক্তি।
একুশ শতকে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ায় ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর নিয়ে গঠিত ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুপ্তপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে, প্রথমত, চীনকে ঠেকানো, দ্বিতীয়ত, এ অঞ্চলে তাদের বাণিজ্যোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তৃতীয়ত, এ সুবিশাল অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মিত্রদের দিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা।
দক্ষিণ চীন সাগরের তীর ঘেঁষে রয়েছে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, ফিলিপিন, ইন্দোনেশিয়া ও তাইওয়ান। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক অঞ্চল নিজেদের দাবি করতে পারে। তাছাড়া ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’। এই অঞ্চলে যেকোনো দেশ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, জলজ প্রাণী বা মৎস্য আহরণ, ইত্যাদি স্বাধীনভাবে করতে পারে। তাই এসব দেশ তাদের সমুদ্রসীমায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে পারে। কিন্তু চীন নাইন ড্যাশ লাইন অনুযায়ী, তার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার সামুদ্রিক অঞ্চল নিজেদের দাবি করছে। তাই এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বিরোধ চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণায় উঠে এসেছে এই অঞ্চলের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের তথ্য, প্রায় ১১ বিলিয়ন গ্যালন তেল ও ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ রয়েছে। তবে বেইজিং বলছে সেখানে প্রায় ১২৫ বিলিয়ন গ্যালন তেল ও ৫০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে চীনের সুবিশাল জনসংখ্যা ও বৃহৎ দেশ হওয়ায় এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের আলাদা নজর রয়েছে। এদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র। চীনের ক্রমাগত সামরিক ব্যয় ও অর্থনৈতিকভাবে পরাশক্তি হওয়ায় এসব দেশ শঙ্কিত। যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বর্তমানে অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের অবস্থান প্রথম। চীন এরই মধ্যে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সরাসরি রোড ও সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের এক মহাপ্রকল্প। যার অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়েছে। আর এ প্রকল্পের মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ব্যাপক উন্নয়নের জন্য মহাসড়ক, সমুদ্র বন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে বিপুল ঋণ দিয়ে আসছে। এ জন্য এসব দেশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা আমেরিকার বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া ক্ষমতার প্রভাবকে হ্রাস করেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল তথা দক্ষিণ চীন সাগর একটি অন্যতম করিডোর। যেখান দিয়ে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য আমদানি-রপ্তানি নির্ভরশীল।
বিশ্বের প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থের বাণিজ্য যে পথে হয়ে থাকে, সেখানে কোনো বিরোধ বা উত্তেজনা সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করবে এটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের অধিকৃত দ্বীপগুলোর কাছাকাছি সামরিক তৎপরতা চালানোর কারণে দেশটি প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রও নিয়মিত মিত্রদের নিয়ে এ অঞ্চলে সামরিক মহড়ার আয়োজন করে আসছে। তবে বেইজিং এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ক্রমাগত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পিছনে বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ও পণ্য আমদানি-রপ্তানির নিরাপত্তা। এজন্য সাগরের অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপে স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ, স্থারবরো শোল অঞ্চল, প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ ও বেশ কিছু প্রবাল দ্বীপসহ চীন এ অঞ্চলে বিভিন্ন কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। চীনা কমিউনিস্ট সরকার এরই মধ্যে নৌশক্তি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সে সঙ্গে দুটি বিমানবাহী রণতরী ও প্রায় ৮০০-এর মতো যুদ্ধজাহজ, নিউক্লিয়ার সাবমেরিন তাদের বহরে যুক্ত আছে।
মিত্রদের পাশে দাঁড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে নিজেদের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে মনোনিবেশ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে আমেরিকার বিপুল সৈন্য মোতায়েন থাকলেও আমেরিকা নিজেদের প্রতিপক্ষ চীনকে চাপে রাখতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে মনোযোগ বৃদ্ধি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিভিন্ন ইস্যুতে বাইডেন সরকারের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ চীনকে মোকাবিলার জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন তার মিত্র দেশগুলোকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে, এর উদাহরণে বলা যায় অস্ট্রেলিয়াকে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন তৈরিতে সহায়তা, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র, এফ-৩৫ ও এফ-১৬-এর মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান বিক্রি। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অনেক সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি। সে সঙ্গে তৈরি করেছে বিভিন্ন সামরিক জোট যেমন- কোয়াড, অকাস্ট ইত্যাদি। ইন্দো-প্যাসিফিকের আরেকটি বিষয় এখন বিশেষভাবে আলোড়িত তা হলো চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্ব। তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের অঞ্চল বলে দাবি করলেও তাইওয়ান নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ভাবে। এ অঞ্চলে ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাইওয়ানকে আমেরিকার প্রয়োজন। তাই তাইওয়ানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য এরই মধ্যে এফ-১৬ ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু চীন ২০৪৯ সালে তাদের শতবর্ষ পালনের আগে তাইওয়ানকে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমেরিকার ভয় বেইজিং তাইওয়ান দখলে নিলে তাইওয়ান প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। যার ফলে আমেরিকা বাণিজ্যিকভাবে সমস্যায় পড়বে। তাই এ অঞ্চলে বেইজিংয়ের একচেটিয়া মনোভাব রুখে দিতে ওয়াশিংটনের পাশে তাইওয়ানকে প্রয়োজন। এ অঞ্চলে আধিপত্য রাখতে পারলে চীন স্বাভাবিকভাবে চাপে থাকবে। চীনের দুর্বলতার আরেকটি দিক হলো- মালাক্কা প্রণালি, আমেরিকা যে কোনোভাবেই হোক এই প্রণালি বন্ধ করে দিলে বেইজিংয়ের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। যদিও চীন পাকিস্তানের গোয়াদর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করে এ নির্ভরতা কমানোর পথে হাঁটছে, তবে পুরোপুরিভাবে তা সম্ভব হবে না। তাই আগামী বিশ্বে এ অঞ্চল নিয়ে দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও চীনের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে দেখার বিষয় ওই অঞ্চলের দেশগুলো এই উত্তেজনার মধ্য কীভাবে নিজেদের ভারসাম্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।
লেখক : শিক্ষার্থী, পলিটিক্যাল স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
"




































