শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ
দৃষ্টিপাত
দরিদ্রতা থেকে মুক্তি মিলবে কবে

বাংলাদেশ যেসব বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম দারিদ্র্য বা দরিদ্রতা। দারিদ্র্য বলতে বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যকীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য অধীনস্থ সম্পদ বা আয়ের অপর্যাপ্ততাকে বোঝায়। দারিদ্র্যের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উপাদান থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে যেসব ব্যক্তি যথেষ্ট পরিমাণে আয় করতে অপারগ, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য জোগানের প্রয়াস নেওয়া হয়। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের জরিপ অনুযায়ী, করোনাকালীন দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে, যা কোভিডের আগের হারের প্রায় দ্বিগুণ। দারিদ্র্যের পাশাপাশি সমাজে বৈষম্যও বেড়েছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। জরিপের এই ফলাফল নিয়ে দেশে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, সানেমের জরিপ একটা স্যাম্পল মাত্র। এই জরিপের মাধ্যমে সারা দেশের দারিদ্র্যের অবস্থা বোঝা যাবে, তেমনটি না হলেও দারিদ্র্য বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
উল্লেখ্য, কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনা করে সানেম। ২০২১ সালের ২৫ জানুয়ারি ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব : সানেমের দেশব্যাপী জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। দেশব্যাপী জরিপটি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়াই জরিপের মূল উদ্দেশ্য। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সঙ্গে যৌথভাবে জরিপ হয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সানেমের জরিপ একটা স্যাম্পল মাত্র। অন্য একটি প্রতিষ্ঠান বলেছে দারিদ্র্য বেড়েছে ৩০ শতাংশ। তবে করোনাভাইরাসের কারণে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ করোনাকালীন অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। প্রবাসীরা বেশ চাপে আছেন। সে হিসেবে সানেমের জরিপ ঠিক আছে বলেই মনে হচ্ছে। সানেমের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বরিশালে ছিল ২৯.৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৩৫.১ শতাংশ, ঢাকায় ৩৮.৪ শতাংশ, খুলনায় ৪১.৮ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪৬.২ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫৫.৫ শতাংশ, রংপুরে ৫৭.৩ শতাংশ এবং সিলেটে ৩৫ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার প্রভাবে দরিদ্র মানুষের সব ধরনের ব্যয় করার ক্ষমতা কমেছে। তবে আয়ের সিংহভাগ খাদ্য কিনতে ব্যয় করার প্রবণতা দেখা গেছে। নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় নেমে আসা মানুষ নিজে থেকে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। তা ছাড়া সার্বিক রেমিট্যান্স আয় বাড়লেও জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলো জানিয়েছে, আগের বছরগুলোর তুলনায় গত বছর বিদেশে থাকা স্বজনরা কম টাকা পাঠিয়েছেন। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালে জিইডি ও সানেমের জরিপে এ হার ছিল ২১.৬০ শতাংশ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.৩০ শতাংশ। বিবিএসের খানা জরিপে ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষ ছিল ২৬.৪০ শতাংশ। ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপে ছিল ২৪.৫০ শতাংশ। সানেমের সর্বশেষ জরিপে তা বেড়ে ৪৫.৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮.৯০ শতাংশ। ২০১৮ সালে ছিল ১৬.৩০ শতাংশ। করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে বেড়ে হয়েছে ৩৫.৪০ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে সাড়ে ২৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে জিইডি-সানেমের জরিপে যা ছিল ৯.৪০ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৮ সালে ১১.২০ শতাংশ ছিল, যা বেড়ে হয়েছে ৩৩.২০ শতাংশ। শহরাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ৬.১০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ। ২০১৮ এবং ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু শিক্ষা ব্যয় কমেছে। অতিদরিদ্র পরিবারে এ হার কমেছে সবচেয়ে বেশি ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশে ২০২০ সালে ২০১৮ সালের তুলনায় মাথাপিছু গড় শিক্ষাব্যয় কমেছে। অতিদরিদ্র পরিবারের জন্য এ হার কমেছে সবচেয়ে বেশি (৫৮ শতাংশ)। অন্যদিকে গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে, মধ্যম দরিদ্র (৯৭ শতাংশ) এবং অ-দরিদ্র (১০৪ শতাংশ) পরিবারের জন্য এটি সবচেয়ে বেশি।
বর্তমান বিশ্বে ১৯৫টি স্বাধীন দেশ আছে। তারা নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা এবং অর্থনীতি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যেহেতু অর্থ ক্ষমতার মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত, সেহেতু বিশ্বের সব দেশ সমান ক্ষমতাধর নয়। এই ক্ষমতার সমন্বয় করার জন্য পৃথিবীতে জাতিসংঘ নামক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে। কিন্তু তার পরও পৃথিবীতে শান্তি কাজ করে না। এর পেছনে সব থেকে বড় কারণ দরিদ্রতা, যা মাথাপিছু আয় এবং দেশের মোট রিজার্ভের ওপর নির্ভর করে হিসাব করা হয়। এদিক থেকে বর্তমান বিশ্বে অনেক কয়েকটি দরিদ্র দেশ আছে, যারা অনেক নিম্নমানের জীবনযাপন করে। দরিদ্রতা অবশ্যই সবচেয়ে গুরুতরগুলোর একটি। আমাদের দেশে এখনো এ ক্ষেত্রে প্রচুর কাজ করার আছে। চরম দরিদ্রতার হার ২০০০ সালে ছিল ৩৪ শতাংশ। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল যে ২০২০ সাল নাগাদ জনগণকে চরম দরিদ্রতা থেকে বের করে আনবে। যদিও সেটি সম্ভব হয়নি। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সংবাদমাধ্যমকে জানান, দেশে ২০০০ সালের খানা (একই রান্নায় খাওয়া এবং একসঙ্গে বসবাস) আয়-ব্যয় জরিপে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০০৫ সালে সেটি কমে আসে ৪০ শতাংশে। ২০১০ সালে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে, ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে এবং ২০১৯ সালে তা কমে আসে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। চরম দারিদ্র্য হ্রাসের চিত্রও একই।
২০০০ সালে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ১ শতাংশ, ২০১০ সালে ১৭ দশমিক ৬ শতাংশে, ২০১৬ সালে ১২ দশমিক ১ শতাংশে এবং ২০১৯ সালে তা কমে আসে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ‘রূপকল্প ২০২১’-কে সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১) প্রণয়ন করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছে। সরকার গৃহীত এসব পরিকল্পনায় দারিদ্র্যবিমোচনে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য নিরসনের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মকৌশল, নীতি এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের শেষপর্যায়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ‘রূপকল্প-২০৪১’ প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে, চরম দারিদ্র্যের হার (বর্তমানে থাকা) ১০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০৩১ সালে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার মাধ্যমে এর পূর্ণ অবসান এবং ২০৪১ সালের মধ্যে মধ্যম দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, অন্যায্যতার একটি রূপ ও পরিচয় হচ্ছে দরিদ্রতা। দারিদ্র্য শুধু কিছু লোকের জন্য ক্ষতিকর তা নয়, সামাজিকভাবেও এটি একটি অন্যায়। দারিদ্র্যকে কীভাবে বদলানো যায়, পাল্টানো যায় সে বিষয়ে কাজ করা প্রয়োজন। অমর্ত্য সেন তার লিখিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘মার্কেটের যে অর্থনৈতিক প্রয়োজন আছে এটা একটি সহজ কথা। অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাকে একটি বড় উপলব্ধি মনে করলে তাতে আমাদের চেতনা শক্তির অভাবেরই পরিচয়। কিন্তু লোকে দুদিকে ভুল করতে পারে। এক হচ্ছে মনে করতে পারেন যে মার্কেটের কোনো প্রয়োজন সত্যিই নেই। এটা না হয়, এ রকম ভ্রান্তি না ঘটে সে বিষয়ে সচেতন হওয়ার অনেক কারণ আছে। অন্যদিকে এ রকম ভুলও হতে পারে যে মার্কেটের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিলে আর চিন্তার কিছু থাকবে না। সেটাও একটা ভুল চিন্তা। মূলত মার্কেটটা হচ্ছে কেদো জিনিস। সুযোগণ্ডসুবিধা করে দেয়। এটা মানতে হবে। এই সুযোগণ্ডসুবিধা সবাইকে পেতে হলে বহু জিনিসের প্রয়োজন। যেমন : শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, লোকদের কেনার ক্ষমতা, মার্কেটে ঢুকতে পারার সুযোগ থাকা; এগুলোর সব কটাতেই রাষ্ট্রের কাজ রয়েছে এবং এনজিওর কাজ রয়েছে। যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ভালো না থাকে তাহলে তো তারা কাজ করতে পারবে না। যেকোনো দেশের জন্যই দরিদ্রতা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। উন্নতির দিকে অগ্রসরের বড় বাধা। আমরা আশা করি, দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে এক দিন আমাদের মুক্তি মিলবে। সব বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশ উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করবে। আমাদের এই আশায় যেন গুড়েবালি না পড়ে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবারই সজাগ দৃষ্টি থাকা আবশ্যক।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
"




































