ওবাইদুল্লাহ আহমাদ হুসাইন

  ১৫ অক্টোবর, ২০২১

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ উপার্জন

মানব জীবনে সম্পদ একটি অপরিহার্য বিষয়। জীবন পরিচালনার জন্য সম্পদের বিকল্প কিছু নেই। যেখানে মানুষের বিচরণ সেখানে সম্পদের প্রয়োজন। মানুষকে যদি সম্পদহীন বাঁচতে দেওয়া হয় তাহলে পানিহীন মাছের মতো মারা যাবে। মানুষ এবং সম্পদ একসূত্রে গাথা। তাই সম্পদ উপার্জন, সংরক্ষণ এবং বণ্টনের গুরুত্ব অপরিসীম। সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদ উপার্জন, সংরক্ষণ ও বণ্টনের নীতিমালাও আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। তবে মানুষের লাগামহীন চাহিদার কারণে সম্পদের উপার্জন, বণ্টন ও সংরক্ষণ পদ্ধতিতে সময়ে সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট নিয়মনীতিকে বাদ দিয়ে সামন্তবাদ, পশ্চাত্য অর্থব্যবস্থা ও চরম উদারনীতিবাদের জন্ম হয়েছে। এছাড়াও ফিজিওক্রেসি, ক্লাসিক্যাল অর্থনীতি ও সমাজতন্ত্রসহ বেশকিছু মানব রচিত অর্থব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে। যেগুলো নানা ধরনের প্রান্তিকতা যুক্ত হওয়াতে ধীরে ধীরে বিলীন হয়েছে।

সম্পদের সীমাহীন প্রয়োজনীয়তার কারণে কোরআন ও হাদিসের অসংখ্য জায়গা সম্পদের উপার্জন, সংরক্ষণ ও বণ্টনের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন পবিত্র কোরআনে সুরা জুমুয়ার ৯নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) হতে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ অর্থাৎ নামাজ শেষ করে সম্পদ উপার্জনে ছড়িয়ে যাও। আয়াত থেকে বোঝা যায় নামাজের পরই হালাল উপার্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রয়োজনীয় সম্পদ উপার্জন ও অনুসন্ধান করা প্রত্যক মুসলমানের ওপর আবশ্যক। যেমন প্রয়োজনীয় ইলম অন্বেষণ করা আবশ্যক। বাইহাকি, শু’আবুল ঈমান। এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদিসে সম্পদ উপার্জনকে ফরজ বলা হয়েছে এবং হালাল পন্থায় সম্পদ উপার্জনে উৎসাহিত করা হয়েছে।

সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু নীতিমালা রয়েছে। ১. সম্পদ উপার্জন করতে হবে। কেননা সম্পদ ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। ২. অবশ্যই শরিয়া বর্ণিত পন্থায় উপার্জন করতে হবে। উপার্জনকে শরিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে মানুষ মানুষের সম্পদ গ্রাস করে ফেলবে। সম্পদ উপার্জনকে জীবনের পরম লক্ষ বানিয়ে অবৈধ পন্থায় উপার্জন করতে থাকবে। মদ জুয়া ও পতিতাবৃত্তি করে সমাজের সামাজিক অবস্থা বিনষ্ট করবে। তাই শরিয়া নির্দেশিত পন্থায় উপার্জন করা আবশ্যক ৩. উপার্জিত সম্পদকে আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ মনে করতে হবে। ৪. উপার্জিত সম্পদ আল্লাহর নির্দেশিত পথে খরচ করতে হবে। তা না হলে অর্জিত সম্পদকে অন্যায় পথে খরচ করে নিজের অনৈতিক চাহিদা পুরণ করবে। ফল হিসেবে ব্যক্তি জীবন ও সামাজিক জীবন হুমকির মুখে পতিত হবে। ৫. নিয়তকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। কোরআন হাদিসে সম্পদ উপার্জনের গুরুত্ব যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ঠিক তেমনি সম্পদ উপার্জনের পদ্ধতিও বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষের চাহিদানুযায়ী যেভাবে ইচ্ছা সম্পদ উপার্জন করতে পারবে না। হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জনকে ইসলাম সমর্থন করে না। মিথ্যা বলে, কাউকে ঠকিয়ে অথবা অন্যের অধিকারহরণ করে উপার্জন করা অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসর করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (সূরা বাকারা : ১৬৮)। হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) একজন ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করলেন, যে মরুভূমিতে দীর্ঘ সফর করেছে। যার চুলগুলো এলোমেলো। ধুলায় ধূসরিত। এ অবস্থায় সে আকাশের দিকে দুহাত তুলে দোয়া করে বলে, ‘হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম। পানীয় হারাম। পোশাক পরিচ্ছদ হারাম। তার শরীর বেড়ে উঠেছে হারাম দ্বারা। অতএব তার দোয়া কীভাবে কবুল করা হবে?’ (সহিহ মুসলিম : ১০১৫)। অর্থাৎ হারাম খাওয়ার কারণে তার দোয়া কবুল করা হবে না।

অন্য একটি হাদিসে হালাল খাওয়ার কারণে হজরত সা’দ (রা.) কে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে সা’দ তুমি তোমার খাদ্যকে উত্তম বানাও। তাহলে তুমি এমন হয়ে যাবে, যার দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। উল্লিখিত কোরআনের আয়াত ও হাদিসগুলোর দিকে নজর দিলে সহজে অনুমান করা যায় হালাল পন্থায় উপার্জনের গুরুত্ব কত বেশি। হারাম খেলে নামাজ রোজা কিছুই কবুল হয় না। এছাড়া হারাম পন্থায় উপার্জনকারীর জন্যও কঠিন হুশিয়ারি উচ্চারণ হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে। হজরত আবু বকর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেই দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যাকে তৃপ্ত করা হয়েছে হারাম দ্বারা। অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তায়ালা যা হারাম করেছেন তা মুখে দেওয়ার চেয়ে মুখে মাটি দেওয়া অনেক ভালো।

লেখক : শিক্ষার্থী, আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক

স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close