মো. তানজিমুল ইসলাম

  ০৫ অক্টোবর, ২০২১

মতামত

শিশুর অধিকার

করোনার কারণে দেড় বছর ধরে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে থাকতে থাকতে প্রায় ক্লান্ত। সম্প্রতি সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস। করোনায় অনেকে আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে অবেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তখন বিষয়টি সচেতন মহলকে নতুন করে অস্থির করে তুলে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা আর যৌতুকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে মফস্বলের অনেক অভিভাবক তাদের কন্যাশিশুদের বিয়ে দিচ্ছেন। মা-বাবাই যেন সজ্ঞানে তাদের শিশুদের মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছেন। একজন শিশুকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া মানে শুধু তার শৈশবও কেড়ে নেওয়া নয়; অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়া তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎও।

বাল্যবিয়ের ফলে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়, স্বাস্থ্যহানি ঘটে, যা সমগ্র দেশের উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলে। পক্ষান্তরে, শিশুশ্রম বৃদ্ধি পায় ও একসময়ে বিবাহিত শিশুটিও অবহেলার শিকার হয় ব্যাপকভাবে। এক জরিপে দেখা যায়, যেসব নারী ২০ বছরের পর বিয়ে করে তারা অন্য নারীদের মধ্যে মোট আয়ের বৃদ্ধিতে দেশের জিডিপি ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারে (ইউনিসেফ)। সম্প্রতি বিয়ে করেছে এমন কিশোরী বধূদের বিভিন্ন কেস স্টাডির মাধ্যমে জানা যায়, কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ কিশোরী কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে এবং যারা এমন দাম্পত্য জীবন থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়।

এ বছর ৪ থেকে ১০ অক্টোবর সব শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে শিশু অধিকার সপ্তাহ-২০২১। শিশু অধিকার সপ্তাহের প্রথম দিনটিই হলো ‘শিশুবিয়ে নিরোধ দিবস’। দিনটি সামনে রেখে এই প্রতিজ্ঞা খুব জরুরি, যে শিশুরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই এবং শিশুদের আরো শিক্ষামুখী করে তোলার জন্য সমন্বিত উপায়ে কাজ করা খুবই জরুরি। করোনার কারণে আগামী দুই বছরে ৪০ লাখ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন। সাউথ সুদান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাল্যবিয়ের শিকার মানুষ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ না হওয়ায় ব্যক্তিত্ব সমস্যায় ভুগতে থাকে। ফলে তারা একসময় রাষ্ট্রের জন্যও বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া জরুরি। সময়ের প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থে সব অনিয়ম-অন্যায়-অনাচার-বৈষম্য-লিঙ্গ সহিংসতা দূরীকরণে সবার ঐকমত্য সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা দেশসেবায় নিয়োজিত হতে পারে। শিশু অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘ ১৯৮৯ সালে একটি শিশু অধিকার সনদ প্রণয়ন করে। একেই বলা হয় জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং জাতীয় শিশুনীতির কাজ হচ্ছে মূলত শিশু অধিকার সংরক্ষণ করা।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের গুরুত্বপূর্ণ গুচ্ছে রয়েছে চারটি। যেমন- বেঁচে থাকার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, চিত্ত বিনোদনের অধিকার এবং অংশগ্রহণের অধিকার। এ ছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের চারটি মূলনীতি রয়েছে। যথা- বৈষম্যহীনতা, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, শিশুদের অধিকার সমুন্নত রাখতে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও শিশুদের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই বিরল। তাই ‘শিশু অধিকার সপ্তাহ’ জনমনে নতুন করে সাড়া জাগিয়ে তোলার একটা অন্যতম প্রয়াস। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদে উল্লিখিত গুচ্ছ ও মূলনীতি অনুসারে, ওই সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি এক যুগোপযোগী উদ্যোগ। এর ফলে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, অবহেলা নিরসনসহ শিশু অধিকারের বীজ বপন সম্ভব। সত্যিকার অর্থে শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে সবাই মিলে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনার কোনো বিকল্পই নেই। আসুন, শিশুর পক্ষে হ্যাঁ বলি। শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করি সর্বত্রই। দৃঢ় কণ্ঠে আওয়াজ তুলি, ‘আমরাই পারি শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।’

লেখক : কো-অর্ডিনেটর, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়