আবুজার গিফারী

  ১০ জুলাই, ২০২১

পর্যালোচনা

প্রচলিত আইনে দেনমোহর ও ভরণপোষণ

সাগর ও মিলি মাস্টার্স সেকেন্ড সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। ফার্স্ট ইয়ার থেকে তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেটা একপর্যায়ে প্রেমে রূপ নেয়। শুরুতে তারা দুজন দুজনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। মাস্টার্স শেষ করে সাগর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নিল। চাকরিটা যেন তার কাল হলো। চাকরির কিছুদিন যেতে না যেতেই সাগরের পরিবার পাশের গ্রামের আসাদ মন্ডলের মেয়ে রিয়ার সঙ্গে সাগরের বিয়ের কথা পাকা করে। রিয়া অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। চেহারা, চরিত্র ও গুণবতী দেখেই কার্যত সাগরের পরিবার, তাদের একমাত্র ছেলের সঙ্গে রিয়ার বিয়ের কথা পাকা করে। প্রথমে সাগর রাজি না হলেও পরিবারের পিড়াপীড়িতে শেষমেশ রাজি হয়। এদিকে মিলি সাগরের এমন হটকারিতায় কষ্ট পেয়ে সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। অতঃপর তিন লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণে সাগর ও রিয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর সাগর ও রিয়ার সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন না যেতেই সাগর মিলির সঙ্গে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করে। প্রথম দিকে রিয়া এটা না জানলেও দুই মাস পর ঠিক জানতে পারে। যখন ঘটনাটি রিয়া জানতে পারে, তখন থেকে রিয়ার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন শুরু হয়। কারণে-অকারণে সাগর রিয়াকে সহ্য করতে পারে না। অর্থাৎ পান থেকে চুন খসলেই সাগর রিয়ার গায়ে হাত ওঠায়। একপর্যায়ে সাগর কাউকে কিছু না জানিয়ে মিলিকে গোপনে বিয়ে করে। রিয়া এ খবর শুনে হতবিহ্বল। রিয়ার পরিবার তখন সাগরের থেকে মেয়েকে ছাড়িয়ে (ডিভোর্স) নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকে। এ সময় গ্রামের মুরুব্বি আজাদ সরদার রিয়ার বাবাকে বলে, ‘তোমার মেয়েকে যদি ওই ছেলে (সাগর) তালাক দেয়, তাহলে তোমার মেয়ে (রিয়া) দেনমোহরের টাকা পাবে। কিন্তু যদি তোমরা তোমাদের মেয়েকে সাগরের থেকে ছাড়িয়ে নাও, তাহলে তোমার মেয়ে রিয়া দেনমোহরের টাকা পাবে না।’ এ কথা শুনে আসাদ মন্ডল খানিকটা হোঁচট খেলেন। ঘটনাটি মেনে নিতে কষ্ট হলেও আমাদের সমাজে এমন ঘটনা হরহামেশায় দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হলো রিয়া কি দেনমোহর বাবদ তিন লাখ টাকা পাবে কি না?

মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহিত মহিলার বিবাহ বিচ্ছেদের ওপর আনীত মামলা সম্পর্কিত বিধান এবং বিবাহিত মহিলার ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগের ফলে তার বিয়ের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সন্দেহ নিরসনের জন্য ১৯৩৯ সালে ‘মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯’ প্রণীত হয়। অত্র আইনের ৫ ধারাতে উল্লেখ আছে, ‘স্ত্রী কর্তৃক বিবাহ বিচ্ছেদের (তালাক) ফলে স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকার খর্ব হবে না।’ অর্থাৎ কোনো মহিলা যদি কোনো কারণে তার স্বামীকে তালাক দেন, তাহলে উক্ত স্বামী দেনমোহরের নির্ধারিত টাকা স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য। আদালত তাকে (স্বামীকে) কোনো অজুহাত দেখানোর সুযোগ দেবেন না। যেমন স্বামী বলতে পারবেন না, ‘তালাকের নোটিস বস্তুত স্ত্রীর পক্ষ থেকে এসেছে, সুতরাং সে দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য না।’ আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে তালাক স্বামী দিলে স্ত্রী দেনমোহর পাবেন, কিন্তু স্ত্রী তালাক দিলে তিনি দেনমোহর পাবেন না। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর ২ ধারাতে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে কোন কোন ক্ষেত্রে তালাক দিতে পারেন তথা কী কী কারণে আদালতের মাধ্যমে স্ত্রী তালাকের ডিক্রি পেতে পারেন, সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেমন চার বছর যাবৎ স্বামী নিখোঁজ, স্ত্রীকে স্বামীর দুই বছর যাবৎ ভরণপোষণ দিতে অবহেলা, স্ত্রী বা সালিস পরিষদকে না জানিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে, সাত বছর যাবৎ বা তার বেশি সময়ের জন্য স্বামী কারাদন্ডে দন্ডিত হলে, স্বামী তিন বছর যাবৎ তার দাম্পত্য পালনে ব্যর্থ, বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে এবং এটি চলমান থাকলে, স্বামী যদি দুই বছর যাবৎ পাগল বা মারাত্মক যৌনব্যাধিতে আক্রান্ত থাকেন। এ ছাড়া কোনো মেয়েকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তার কোনো অভিভাবক তাকে বিয়ে দিলে এবং ১৯ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মেয়ে যদি উক্ত বিয়ে অস্বীকার করেন, তাহলে সে তালাকের ডিক্রি পাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, উক্ত সময়ে যৌনমিলন বা শারীরিক সম্পর্ক হওয়া যাবে না। এমনকি স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেন, যেমন অভ্যাসগত আঘাত, অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য, ধর্ম পালনে বাধ্য এবং স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি স্বামী তাকে হস্তান্তর করতে বাধ্য করলে স্ত্রী তালাকের জন্য আদালতের মাধ্যমে ডিক্রি পেতে পারেন। সুতরাং অত্র আইনের ২ ধারামতে, রিয়া আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি পেতে পারেন এবং এই আইনের ৫ ধারামতে, তালাক দেওয়া সত্ত্বেও রিয়া দেনমোহরের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।

নাদিম ও নাবিলা দুজন ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তারা ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে চার বছর হলো। হঠাৎ নাবিলা ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেন। অতঃপর নাবিলার যদি কোনো কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, তাহলে নাবিলা কি দেনমোহরের টাকা পাবেন? নাকি ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে দেনমোহরের অধিকার বিলুপ্ত হবে?

মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর ৪ ধারাতে উল্লেখ আছে, কোনো মহিলা যদি ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করেন, তাহলে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটবে না। অত্র আইনে আরো উল্লেখ আছে, ‘এরূপ অন্য ধর্ম গ্রহণ করা সত্ত্বেও উক্ত মহিলা ২ ধারা অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি লাভের অধিকারী হবেন। তবে কোনো মহিলা তার নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর পুনরায় তার ধর্ম গ্রহণ করলে এই আইনের বিধানাবলি উক্ত মহিলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ তার নিজ ধর্মে ফিরে গেলে তিনি ২ ও ৫ ধারানুযায়ী যথাক্রমে তালাকের ডিক্রি ও দেনমোহরের টাকা পাবেন না। সুতরাং প্রচলিত আইন অনুযায়ী নাবিলা দেনমোহরের টাকা পাবেন। অর্থাৎ অত্র আইন অনুযায়ী আমরা এটা বলতে পারি যে, নারীর দেনমোহরের অধিকার একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার। কোনো কারণে এ অধিকার থেকে নারী বঞ্চিত হবেন না।

আবু সালেহ ও শাপলা ২০১৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। পারিবারিক কলহের জেরে বিয়ের ২ বছর পর ২০২১ সালে আবু সালেহ শাপলাকে প্রচলিত আইন অনুসারে তালাক দেন। এখন প্রশ্ন হলো শাপলা কত দিন যাবৎ সালেহর থেকে ভরণপোষণ পাবেন?

সাধারণ অর্থে একজন স্ত্রী বিবাহ বলবৎ থাকা অবস্থায় স্বামী থেকে ভরণপোষণ পাবেন। ভরণপোষণ একজন স্ত্রীর আইনগত অধিকার। স্ত্রী যত দিন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে এবং স্বামীর যুক্তিসংগত নির্দেশগুলো পালন করবেন, তত দিন ভরণপোষণ দিতে স্বামী বাধ্য। তবে স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানান বা অন্যভাবে তার প্রতি অবাধ্যতা দেখান, তাহলে স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন না। ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক নাবালক স্বামীর পক্ষে তার পিতা ভরণপোষণ দেবেন। এমনকি স্ত্রী আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও সে ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন। অর্থাৎ দেনমোহরের মতো ভরণপোষণের অধিকারও স্ত্রীর অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বস্তুত স্বামীর মৃত্যুর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্ত্রী ইদ্দতকালে কোনো ভরণপোষণ পান না। তবে তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্ত্রী ইদ্দতকালেও স্বামী থেকে ভরণপোষণ পান। সুতরাং প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাপলা তার স্বামী আবু সালেহর থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত ভরণপোষণ পাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে শাপলা যদি গর্ভবতী থাকে, তাহলে সন্তান জন্মদানের আগ পর্যন্ত সালেহর থেকে শাপলা ভরণপোষণ পাবেন। ইদ্দতকাল হলো, তালাক কার্যকর হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিন তথা তিন মাস। তবে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্য ইদ্দতকাল হবে ৪ মাস ১০ দিন। স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী ভরণপোষণের জন্য মামলা করতে পারবেন। এমনকি তালাকের জন্য পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ স্ত্রী এ ক্ষেত্রে The Family Court Ordinance, 1985-এর ৫ ধারার বিধান অনুযায়ী ভরণপোষণের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। এ ছাড়া The Muslim Family Laws Ordinance, ১৯৬১-এর ৯ ধারার অধীন ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য স্ত্রী সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান উপযুক্ত ভরণপোষণ নির্ধারণ করবেন। তবে স্ত্রী যদি চেয়ারম্যানের আদেশে সন্তুষ্ট না হন অর্থাৎ স্ত্রী সংক্ষুব্ধ হলে সহকারী জজ আদালতে রিভিশন করতে পারবেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে ভরণপোষণ-সংক্রান্ত বিখ্যাত মামলা Hefzur Rahman Vs Samsun Nahar (51 DLR, 1999 AD 200) ও ভারতে ভরণপোষণ সংক্রান্ত দুটি বিখ্যাত মামলা- Ahmad Khan Vs Shah Banu (AIR 1985, SC 985) Ges Daniel Latif Vs Union of India (2001, 7 SCC, 740))। কার্যত প্রতিটি মামলার সিদ্ধান্তেই আদালত ভরণপোষণের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছে।

দেনমোহর ও ভরণপোষণ পারিবারিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কার্যত দেনমোহর ও ভরণপোষণ নিয়ে প্রচলিত আইনে বিশেষ বিধান লক্ষ করা গেলেও বাস্তব জীবনে এসে আমরা সবাই খামখেয়ালিপনার আশ্রয় নিতে কুণ্ঠাবোধ করি না। অচিরেই আমরা আমাদের এমন হীন মনমানসিকতা দূর করে খাঁটি মানুষে পরিণত হব। আর এটা আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাস্তবে রূপ নেবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়