ফারহান ইশরাক
পর্যালোচনা
বাঙালি রেনেসাঁসের ভিত্তি ভাষা আন্দোলন

পৃথিবী নামক এই গ্রহটির বুকে মানবজাতির দীর্ঘদিনের পথচলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাপ্তি হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা। পৃথিবীতে রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠার মাধ্যমে নাগরিক সমাজের উদ্ভব ঘটেছে। যদিও দেশ ও রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে, তবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশই এক একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। সেই অর্থে বিশেষ কার্যাবলিকে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে যদি বিবেচনা করা যায়, তাহলে দেশ ও রাষ্ট্র প্রায় সমার্থক অর্থই বহন করে। আমাদের পৃথিবীতে অসংখ্য জাতি রয়েছে। রয়েছে দেশ তথা রাষ্ট্র। কিছু কিছু দেশে একাধিক জাতির বসবাস, আবার একই জাতি কয়েকটি ভিন্ন দেশের অধিবাসী এমন উদাহরণও রয়েছে। প্রতিটি জাতির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, একটি মানুষের রাষ্ট্রীয় বা নাগরিকত্বের পরিচয়ে পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু জাতিগত পরিচয় সর্বদাই স্বতন্ত্র। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের বাংলাদেশ ভূখন্ড বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হয়েছে, শাসিত হয়েছে ভিন্ন দেশের মানুষ দ্বারা। যখন যে জাতি বা রাষ্ট্রের উপনিবেশ কিংবা শাসনের অধীনে ছিল, তখন সে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই ভূখন্ডের অধিবাসীরা। তাই শাসকশ্রেণির বদলের ফলে নাগরিকত্বেরও বদল ঘটেছে বাঙালিদের। কিন্তু নাগরিকত্বের বদলের ফলেও তাদের এই জাতিগত পরিচয় কখনো মুছে যায়নি। মোগল আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এমন অনেক পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু ‘বাঙালি’ শব্দটি ধ্রুবতারার মতো সত্য হয়ে এ জাতির অস্তিত্বের জানান দিয়ে এসেছে।
একটি জাতির স্বাতন্ত্র্য পরিচয়ের মূল উপাদান তার ভাষা ও সংস্কৃতি। জাতিগত পথপরিক্রমা আবর্তিত হয় এই উপাদান দুটি ঘিরেই। তাই কখনো কোনো কারণে যদি একটি জাতির ভাষা কিংবা সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসে, তখন সে আঘাতটি জাতির অস্তিত্বকে বিলীন করে দেওয়ারই শামিল। হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলার মানুষ বহু শাসনামল প্রত্যক্ষ করেছে। বহু জাতি নানাভাবে শাসনের নামে শোষণ চালিয়েছে এ দেশের মানুষের ওপর। লুট করেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। মানুষকে হত্যা করেছে, চালিয়েছে নির্মম অত্যাচার। কিন্তু বাঙালির ভাষা কিংবা সংস্কৃতির ওপর আক্রমণের দুঃসাহস করেনি কেউ। আবহমানকাল ধরে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর প্রথম আঘাত আসে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মাধ্যমে পাকিস্তান নামের যে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তার দুটি অংশের মধ্যে ছিল হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব, ছিল জাতিগত, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত পার্থক্য। এ রকম অদ্ভুত বৈসাদৃশ্য বোধ করি পৃথিবীর আর কোনো দেশে কখনো ছিল না।
ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঙালিদের ‘ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করলেও বাস্তবে বাঙালিদের প্রতি সব সময়ই বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে বিলুপ্ত করার প্রথম প্রয়াস হিসেবে তারা বাংলা ভাষাকে উর্দুর মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের ঘৃণ্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা আসে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অথচ তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। ভাষার ওপর এমন আঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় প্রতিবাদী বাঙালি জনতা। এই প্রতিবাদ ধীরে ধীরে রূপ নেয় সংঘবদ্ধ আন্দোলনে। বাঙালির ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসের বিরলতম একটি ঘটনা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য রক্তদানের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ কেবল নতুন ইতিহাসই রচনা করেনি, বরং বাঙালির জাতীয় জীবনে এনেছে নতুন স্রোত। ভাষা আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাঙালিকে স্বাধীনতা আদায়ের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার অমৃত স্বাদ লাভের বীজ বপিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই।
ভাষা আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান। বাঙালির জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে সে উদ্দেশ্য পূরণও হয়েছে কয়েক বছর পরেই। তবে এই স্বীকৃতির পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির জাতীয়তাবাদের পালে লেগেছিল নতুন হাওয়া। এই আন্দোলন বাংলার মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছিল। জীবনভর যাদের বেড়ে ওঠা ছিল সাধারণ বাঙালি হিসেবে, এই আন্দোলন প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে অধিকার সচেতন মানুষ হিসেবে তৈরি হতে লাগলেন। রাজনীতি নিয়ে যে মানুষগুলোর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না, রাজনৈতিক ঘটনাবলি নতুন করে ভাবতে শেখাল তাদেরও। জাতিগতভাবে বাঙালির রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠার শুরু এখান থেকেই। আবার এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ব্যাপক সরব হয়ে উঠেন বাংলার কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী কয়েক দশক ছিল আমাদের বাঙালিয়ানার সময়। প্রতিটি বাঙালির মধ্যে নিজেদের জাতীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখার দুর্দমনীয় প্রয়াস তখন তুঙ্গে। পুরো ষাটের দশক, সত্তরের দশক ধরে বাঙালির সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটছিল আপন মহিমায়। তবে সাংস্কৃতিক বিকাশের মোড়কে সেই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই বিকাশ ঘটছিল বাংলাদেশজুড়ে। ভাষা আন্দোলন পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদ, নিজেদের অধিকার আদায়ের প্রাণপণ ইচ্ছা ছড়িয়ে পড়েছিল বিস্ফোরণের মতো। জাতীয়তাবাদী বিস্ফোরণের এই বারুদই একযোগে জ্বলে উঠেছিল ১৯৭১ সালে।
একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। আন্দোলন, সংগ্রাম, সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়াও স্বাধীনতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হলো জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর যদি ভাষা আন্দোলন সংঘটিত না হতো, তাহলে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা লাভের জন্য আরো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের প্রস্তুতি পর্বের সূচনা ঘটেছিল এই আন্দোলনটির মাধ্যমে। বাস্তবিক অর্থেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের প্রথম ধাপ ভাষা আন্দোলন। পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহের সৃষ্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরের উপকণ্ঠে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্ম, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সামষ্টিক অগ্রযাত্রা অন্য সব দেশের তুলনায় অনন্য। আর এই অনন্যতার প্রধানতম ভিত্তি বাঙালির ভাষা আন্দোলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে পৃথিবীব্যাপী যখন নব্য সমাজব্যবস্থার ব্যাপক উত্থান ঘটছিল, তারই সমান্তরালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদই পরে বাঙালির স্বাধীনতার পথকে প্রশস্ত করে তোলে। পাশাপাশি সেসময়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, চলচ্চিত্র, মনন, মানসে ভাষা আন্দোলনের যে তাৎক্ষণিক অথচ একই সঙ্গে গভীর এবং শক্তিশালী একটি প্রভাব পড়েছিল, সেটিও ভূমিকা রেখেছিল বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বেগবান করে তুলতে। মূলত এরই মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভাষা আন্দোলনের উপজাত হিসেবে উদ্ভব ঘটে বাঙালি রেনেসাঁসের; যার ওপর সওয়ার করেই বাঙালির বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু।
লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স
বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
"




































